1. abutalha6256@gmail.com : abdul kadir : abdul kadir
  2. abutalha625616@gmail.com : abu talha : abu talha
  3. asadkanaighat@gmail.com : Asad Ahmed : Asad Ahmed
  4. izharehaq24@gmail.com : mzakir :
বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১, ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন

অলিঙ্গীয় রমণীকুল | হোসনে আরা মণি

রিপোর্টার নাম:
  • প্রকাশটাইম: মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২১

তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন। হয়তো ঘুমিয়ে নয়, জেগে। নয়তো আধো-ঘুম আধো-জাগরণের তন্দ্রালুতার ঘোরে। এরকম স্বপ্ন তিনি প্রায়ই দেখেন—স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন কিংবা অতিস্বপ্ন। কেন দেখেন তা নিয়েও ভাবেন। আর এই ভাবনাটাও ভালো জমে ঘুম ও জাগরণের চেতন-অচেতন বোধের মাঝে।

তিনি খোয়াবনামা পড়েন না। এজন্য নয় যে, তিনি সম্পূর্ণ কুসংস্কারমুক্ত মানুষ। সমাজের অতি-বিরল যুক্তিবাদীদের কেউ তিনি নন। তবু তিনি তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা খুঁজতে খোয়াবনামা খোলেন না। তিনি ভালো করেই জানেন যে তার স্বপ্ন লেখার মগজ খোয়াবনামার লেখকের নেই।

ফ্রয়েড সাহেবের স্বপ্ন বিষয়ক তত্ত্বেও তার আস্থা নেই। অবচেতন মনই যদি সব স্বপ্নের চালক হয় তবে তিনি এতদিনে নিশ্চয়ই একবার স্বপ্ন দেখতেন মারুফাকে—যে মানবী এক সময় তার চেতন জগতের সবটা নিয়ে বাস করতো ।

কাজেই অবচেতন মন নয়। না, তার মনের গহনে কখনো অমন বাসনা ঘুমিয়ে থাকতেই পারে না। তিনি নারীতে পরিণত হয়েছেন—ঠিক পরিণত হওয়া নয়—তিনি আসলে একজন নারী এবং এমন নারী যার দেহে কি না…না, না, নাহ্! অমন কখনোই ঘটতে পারে না। অমন ঘটলে যে পৃথিবী চলতে পারে না। আসলে কি তাই? পৃথিবীর সব চলা কি নারীঅঙ্গের কমনীয়তা আর দূর্বলতার ’পরে দাঁড়িয়ে? নারী যদি তার স্বপ্নের মতো বদলে যেত বা নারী যদি জন্ম থেকেই হতো তার স্বপ্নের অনুরূপ, তবে কি থেমে যেত পৃথিবীর তাবৎ কোলাহল? তিনি জানেন না। নারীর সেই অসম্ভব বিবর্তন তিনি জেগে থেকে কল্পনা করতেও সাহস করেন না। পাছে বিজ্ঞানীদের কল্পনার মতো তার আজকের কল্পনা আগামীতে বাস্তব রূপ ধরে!

এই তো তার দেহ তিনি দেখতে পাচ্ছেন। কাচের মতো স্বচ্ছ পোশাক ভেদ করে তিনি দেখছেন তার পূর্ণ অবয়ব। আর কী আশ্চর্য! তার নিজেকে দেখতে কোনো আয়নার প্রয়োজন হচ্ছে না। তিনি ইচ্ছে করলেই নিজের আপাদমস্তক দেখতে পাচ্ছেন যেকোনো কোণ থেকে। আর তিনি বিস্ময়ের সাথে বারবার বিশেষভাবে দেখতে থাকেন সেই অঙ্গস্থানগুলো যা কেবল প্রস্ফুটিত থাকে নারীদেহে। তিনি নারীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। কিন্তু তার দেহের নারীঅঙ্গগুলো বড়ই রহস্যময়। এগুলো কখনো প্রকটভাবে দৃষ্টি-আকর্ষী, কখনো একেবারেই লুপ্ত। অবিকশিত নারী শরীরেও থাকে যে স্বল্পায়তন নারীঅঙ্গ, তার দেহে মাঝে মাঝে তাও হয় অনুপস্থিত। অথচ তার শরীরের অপর সকল অঙ্গ নারীর মতোই পেলব, লাবণ্যময়। তাহলে? তিনি কেমন নারী? আচ্ছা, এমন কি কেউ নেই যার কাছে ব্যাপারটার রহস্য জানতে চাওয়া যায়? পাশেই তো শুয়ে আছে ত্রিশ বছর একত্রবাসের সঙ্গীনী। তাকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়? কিন্তু না, তিনি যে ঘুম-জাগরণের স্বপ্নঘোর জগতে আছেন সেখানে কেবল অবাস্তবের রাজত্ব। বাস্তব জগতের কেউ পাশে শুয়ে এমনকি গলা জড়িয়ে থাকলেও স্বপ্নজগতে তাকে সাথী করা যায় না। আবার নিজেরও স্বপ্নজগত থেকে স্বেচ্ছায় বাস্তবে ফেরা চলে না। কাজেই এক রহস্যময় নারীদেহের অধিকারী তিনি প্রকৃতই নারী কিনা সে সংশয় মনে নিয়েই স্বপ্ন দেখতে থাকেন।

তিনি দেখেন বিশাল বড় এক ময়দান। কোনো এক ঐন্দ্রজালিক পর্দা যেন তার সম্মুখ হতে অপসারিত হয় আর উদ্ভাসিত হয় মেঘভাঙা আকাশতলে গোধূলিলগ্নের এক প্রান্তর। সেখানে নাগরদোলা, ঘূর্ণি আর পুতুলনাচ নিয়ে জাঁকিয়ে বসেছে এক মেলা। মেলায় এসছে নানা রঙ ও ঢঙে সজ্জিত কতো মনোহর নারী! ফিটফাট বাবু সাজে এসেছে পুরুষেরাও। তাদের পরস্পরের মাঝে চলছে কিছু খুনসুটি। নারীদের চিকন-কোমল দেহ কখনো উচ্ছ্বল হাসির সাথে লতার মতো লুটছে তো কখনো দেমাগে কোমর দুলিয়ে বড় বড় পা ফেলে হাঁটছে। পুরুষেরা লেগে আছে নারীদের পিছে, দেখছে চেয়ে চেয়ে লালসাসিক্ত অতৃপ্ত নয়নে। নারীরা হাসে, কাজলটানা চোখ ঘুরিয়ে ইতিউতি তাকায়। নারীরা কথা কয়—কোকিল-চড়ুই-দোয়েল-তিতিরের কাকলি আর নদীর কলতান তাদের কথায়। পুরুষেরা এক অদ্ভুত মোহে মোহিত, অপূর্ব আবেশে আবেশিত হতে থাকে। কোন এক বিদ্যুৎ-চৌম্বক তরঙ্গে তাড়িত হয়ে তারা ছুটতে থাকে নারীদের দিকে। কিন্তু নারীরা যেন বুনো হরিণী। তাদেরকে ধরতে গেলে তারা পালাতে থাকে। তবে ফাঁদ পাতলে তারা ধরা পড়ে সহজেই। ফাঁদ পেতে অপেক্ষায় থাকার ধৈর্য্য নেই যেসব পুরুষের, তারা যাকে নাগালে পায় তাকে সেখানেই পেড়ে ফেলতে চেষ্টা করে কিংবা টেনে নেয় মেলা থেকে একটু দূরে কোনো এক টুকরো আবডালে।

নারীরা বাঁধা দেয়। পুরুষেরা তবু উপগত হতে উদ্যত হয়। আর কী আশ্চর্য! তারা দ্বার খুঁজে পায় না। নারীদেহের গোপন কবাট তারা এমনই সীলকৃত দেখতে পায় যে, সে কবাটকে প্রবেশ্য করে তোলা বুঝি ইয়াজুজ-মাজুজেরও কম্ম নয়। কিন্তু তারা তো হাল ছাড়ার পাত্র নয়। তারা খুঁড়ে বের করতে চেষ্টা করে গুপ্ত কবাট। কেউ ব্লেড, কেউ ছুরি, কেউ শাবল-কোদাল-কাস্তে-তরোয়াল—যে যা পায় তা নিয়েই ঝাপিয়ে পড়ে কবাট খুলতে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। একটু আঁচড় কাটতেও তারা সক্ষম হয় না নারীদের দুর্ভেদ্য প্রাচীরে। তারা ফিরে যায় ঘরে। ব্যর্থতার গ্লানি ও ক্ষোভ দেহ-মনে মাখামাখি হয়ে তারা চেষ্টা করে ঘুমাতে। আর পরদিন…।

ঠিক পরদিন তারা আবিষ্কার করে যে তারা নারী। তবে সার্বক্ষণিক নারী নয়। তারা তখনই নারী যখন তারা কামনা করে কোনো নারীকে।

তারা যায় শহরে কাজীর কাছে বিচার দিতে।

কাজী সব শোনেন গভীর মন দিয়ে। হেকিম ডেকে যাচাই করে দেখেন পুরুষদের মস্তিষ্কের সুস্থতা। তারপর ডেকে পাঠান নারীদের।

নারীরা এলে কাজী তাদের তাকিয়ে দেখেন। কই, পুরুষদের অভিযোগমতো কিছু তো নজরে পড়ছে না। ঐ তো দেখা যায় উদ্ধ্যত হয়ে থাকা প্রকট সব নারীঅঙ্গ। যা উদ্ধ্যত নয়, নয় পোশাক ফুঁড়ে অস্তিত্ব জানান দেয়ার মতো, তা কি সত্যি অনুপস্থিত এসব লাবণ্যময় অঙ্গে? কিন্তু পুরুষেরা তো বলছে যে তারা পোশাকের বাইরে থেকে প্রকট অঙ্গের উপস্থিতির প্রকটতায় মোহিত এমনকি হিতাহিত জ্ঞানহারা হয়ে…। তার মানে আপাতদৃষ্টিতে এসব প্রলুব্ধকর অঙ্গসমূহ দৃষ্টি-আকর্ষী হয়ে নারীদেহে শোভিত থাকলেও ঐ বিশেষ সময়ে তা পুরুষদের প্রবঞ্চিত করেছে বড় নির্মমভাবে। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব হতে পারে?

কাজীর নির্দেশে গঠিত আধুনিক মেডিক্যাল টিম নারীদেরকে পরীক্ষা করে। তাদের পেশকৃত রিপোর্ট হাতে বিজ্ঞ কাজী স্তব্ধ হয়ে থাকেন বহুক্ষণ।

মামলা জমে ওঠে। উকিলেরা উচ্চ-কর্কশ স্বরে জ্বালাময়ী বক্তৃতা করে। সে বক্তৃতা থেকে জানা যায় নারীদের যত শয়তানী, বজ্জাতি আর হুজ্জতি ফেৎনার কথা। জানা যায়, কেমন করে তারা পুরুষদের বুদ্ধি ঘুলিয়ে তাদেরকে বেপথে টানে, দেহের বাঁকে বাঁকে লোভের হাতছানি ফুটিয়ে টেনে নেয় নরকের দুয়ারে। তারপর কেমন করে সরলপ্রাণ পুরুষদের বুকে দাগা দেগে ফিরিয়ে দেয় গোপন দুয়ারে তালা এঁটে, সে কথাও উকিলেরা বলে সবিস্তার।

হুজুর, ওদের হাড়ে হাড়ে বজ্জাতি। শুধু গুপ্তদুয়ারে তালাই নয়, ওদের বুকে সদাউদ্ধ্যত তাজিংডংও সময়ে সময়ে হয়ে পড়ে যেন গাঙ্গেয় সমতল ভূমি।

হুম, কিন্তু কীভাবে এটা ঘটে?

তা তো হুজুর আমরা বলতে পারবো না। আমরা শুধু এই জানি যে এই নারীরা পুরুষদের চরম কষ্ট দেয়ার কিছু কৌশল কিভাবে যেন রপ্ত করেছে। পুরুষের কামনাকে তাতিয়ে তারপর তাদেরকে চরম তাচ্ছিল্যভরে উপেক্ষা করা, তাদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বরং নিজেদের প্রবেশ্য স্থানকে অপ্রবেশ্য আর উদ্ধ্যত অঙ্গকে দেহাভ্যন্তরে লুকিয়ে নেয়ার কৌশল তাদেরকে পুরুষদের জন্য ভয়ঙ্কর শাস্তির প্রতীক করে তুলেছে। এর চেয়ে যদি তারা পুরুষ জাতটাকে নপুংশক করে দিত তবে সেও বরং ছিল সহনীয়। কিন্তু তারা তা না করে আরো সাংঘাতিক রহস্যময় কাজ করেছে। তাদের কাছ থেকে ফিরে আসা পুরুষেরা কখনো নারী, কখনো পুরুষ, কিন্তু উভয় ভূমিকাতেই ব্যর্থ জীবনযাপন করছে।

বিবাদীগণের এ বিষয়ে বক্তব্য কী?

হুজুর, আমরা তাদেরকে সম্পূর্ণ নপুংশক করার পক্ষপাতী নই। ওদের পৌরুষ মাঝে মাঝে আমাদের খুবই কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু সমস্যা এখানে যে, ওদের কেউ কেউ সময়-অসময়, স্থান-কাল, এমনকি মতামতের তোয়াক্কা কিছুমাত্র না করেই যাচ্ছেতাই আচরণ করতে চেষ্টা করে। তারা আমাদেরকে ওই সময় মানুষের সম্মান তো দেয়ই না, এমনকি জীবের প্রতি যে সাধারণ মমত্ববোধ মানবিকতার অংশ তাও তাদের আচরণে লক্ষ্য করা যায় না। তারা আমাদের দেহ-মনের উপযুক্ততার বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় না। এমনকি আমাদের বয়সও তারা বিবেচ্য বলে জ্ঞান করে না। হুজুর জানেন, তারা একসময় আমাদের কন্যাদের ঋতুমতী হওয়ার বহু আগেই বিবাহ ও সহবাস করতো। আইন করে সে প্রথা তুলে দেয়ার পর তারা আমাদের শিশু-কন্যাদেরকে বলাৎকার করতে পছন্দ করা শুরু করলো। ব্যাপারটা এমন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো যে তাদের কাছে ছয় মাসের শিশু-কন্যাও আর নিরাপদ থাকলো না। কোনো আইন-আদালত তাদের এই লালসাকে নিবৃত করতে পারছিল না। বরং ওদের সংখ্যা বেড়ে চলছিল ক্রমবর্ধমান হারে। অবস্থা অবশেষে এমন হতে শুরু করলো যে অত্যন্ত ঘনিষ্ট রক্ত-সম্পর্কীয় পুরুষেরাও আর মেয়েদের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত হচ্ছিল না। ভাইয়ের কাছে বোন, বাবার কাছে কন্যাও যদি নিরাপদ না হয় তবে আর নারীরা বাঁচবে কোথায়? হুজুর জানেন দেয়ালে পিঠ ঠেকলে ভীরু-নিরস্ত্র মানুষও ঘুরে দাঁড়িয়ে দাঁত-নখ বের করে লড়াই করতে চেষ্টা করে। আমাদেরও সেই দশা হলো। আমরা তখন মন দিলাম গবেষণার কাজে। কোন সে ব্যবস্থা যা উদ্ভাবন করলে আমরা বেঁচে থাকতে পারবো আমাদের মনোমতো জীবনে?

পরীক্ষা-নিরীক্ষা চললো নানা রকম। আমরা যদি আমাদের নারীচিহ্নগুলো দেহ থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেই তবে নিশ্চয় পুরুষেরা আমাদের উপরে হামলে পড়তে প্রলুব্ধ হবে না? কিন্তু আমাদের প্রকল্পবোর্ডে যে পরিসংখ্যানবিদ ছিলেন তিনি বললেন ভিন্ন কথা। পৃথিবীতে যে পরিমাণ বালিকা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, বালক নিপীড়ন তার চেয়ে কম হলেও সংখ্যাটা একবারে নগণ্য নয়। আর বালকদের নিপীড়নকারীরা হয় সাধারণত—বড় বালক, নয়তো বয়স্ক পুরুষ।

হুজুর, আমি এই বিবাদীর কথার মাঝে একটু ভিন্নমত যুক্ত করছি। নারীরাও কিন্তু কখনো কখনো পীড়নকারী হয়ে থাকে এবং সেটা পাণিপীড়নতুল্য আনন্দের নয় মোটেও।

বাদীপক্ষের মোক্তারের যোগ্য কথাই বটে। সম্ভবত, তিনি নিজেই ভুক্তভোগী নারীপীড়িত।

আদালতে হো-হো হাসির হল্লা ওঠে। কাজীও মুচকি হাসি কোনোমতে লুকিয়ে প্রশ্ন করেন, তাহলে এ বিষয়ক মামলা কেনো করা হয় না?

কারণ, এটুকু শুনে আজ এ আদালত হাসছে। মামলা করলে যে দেশশুদ্ধ লোক হাসবে।

প্রথমে হয়তো হাসবে, তারপর সিরিয়াস হয়ে চিন্তা করবে যে অপছন্দের বিষয়ে আইনের আশ্রয় নেয়ার অধিকার সকলেরই আছে।

হুজুর মহান বিজ্ঞ দূরদর্শী সুবিচারক। আমরা এবার বিবাদীকে তার বক্তব্য সমাপ্ত করার সুযোগ দেই।

হুজুর, পরিসংখ্যানবিদের কথা শুনে মনে হলো যে, আমাদের দেহে নারীঅঙ্গের উপস্থিতিই সমস্যার মূলে নয়। সমস্যাটা আসলে পুরুষাঙ্গের। ওটা বড্ড বেশি ক্ষুধার্ত সর্বভুক ও অদূরদর্শী চরিত্রের। তাই কোনোভাবে যদি ঐ অঙ্গটির আগ্রাসী আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তবেই এ নারকীয় যন্ত্রণার উপশম হয়। মনে করুন, প্রজননের প্রয়োজনে একটা নির্দিষ্ট বয়সের অল্প কিছু দিন ছাড়া বাকি সময়টা যদি ওদেরকে নিরুত্তাপ করে রাখা যায়…। কিন্তু এ প্রস্তাবে নারীরাই সম্মত হলো না। প্রজননের উদ্দেশ্য ছাড়াও তো পুরুষ নারীর কাছে কাঙ্ক্ষত, নয় কি?

তা তো বটেই। মানবী তো আর গাভী নয় যে…। কাজী জনান্তিকে বললেন।

আবার প্রস্তাব এলো যে, আমাদের ছেলে শিশুরা জন্মের পর যে বিভিন্ন ব্যাধি প্রতিরোধক টিকা পেয়ে থাকে তার সাথে এ টিকাও দিয়ে দেয়া হবে যাতে করে তারা জীবনে উদ্দিষ্ট নারী প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত যৌনতাড়িত না হয়।

আদালতে গুঞ্জন উঠলো। অনেকেই বিস্ময় ও কেউ কেউ বিরক্তি প্রকাশ করলো।

হুজুর, এখানে অনেকের মনেই নিশ্চয় এ প্রস্তাবের সম্ভাব্যতার বিষয়ে নানা প্রশ্নের উদ্রেক ঘটেছে। উদ্দিষ্ট নারী বলতে কিছু পুরুষের জীবনে-মননে আদৌ থাকে কি না…। ব্যাপারটাকে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে আপনি বিবাহ বলতে পারেন। বিবাহের পূর্বদিনে পুরুষের শরীরে তার ছেলেবেলায় দেয়া টিকা বিনষ্টের ওষুধ প্রয়োগ করে…। কিন্তু এখানেও বহু মত। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন ঘটিয়ে ধর্ষণ কিছুটা কমানো গেলেও দূরীভূত করা তো সম্ভব নয়—যেখানে বেশিরভাগ ধর্ষকই বয়ষ্ক ও বিবাহিত!

এরপর এলো এক যুগান্তকারী প্রস্তাব। প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি পাশ হলো, প্রকল্প প্রণীত হলো এবং বিপুল ব্যয়সাধ্য গবেষণার পর যে ওষুধ আবিষ্কার হলো তা পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পর ফলাফল তথ্য-উপাত্তসমেত বোর্ডে উপস্থাপিত হলো। কিছুটা বিস্ময় নিয়েই লক্ষ্য করা গেল যে, এ প্রকল্প আমাদের নারীদের এক বড় অংশকেই তুষ্ঠ করতে পারেনি। বস্তুত, আমরা নারীরা ধর্ষণ ও ধর্ষককে ঘৃণা করলেও কোনো রোবটকেও কাম্য বলে ভাবি না। ঐ ওষুধ প্রয়োগের পর আমাদের পুরুষেরা এমন রোবটে রূপান্তরিত হয়েছিল যা আমাদের আগ্রহতেও ধ্বস নামিয়েছিল—যদিও ওদের কন্ট্রোলবাটন ছিল আমাদেরই হাতে।

যাহোক, এরপর পরীক্ষামূলকভাবে ওদেরকে নিয়ে আরো কিছু প্রকল্প গৃহীত হলেও কোনোটাই তেমন লাগসই হয়নি। তাছাড়া এটাও ভাবা হলো যে, অন্যের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া তার অনুমতি ছাড়া বদলে দেয়া আইনসঙ্গত বা মানবিক কাজ নয়। তাই অবশেষে আমরা ওদের যারা নিরাপরাধ—যদিও সংখ্যায় তারা নগণ্য, তাদের সম্মানে ওদেরকে ওদের মতো থাকতে দেয়াই মনস্থ করলাম। শুধু বদলে নিতে চাইলাম নিজেদের। আর প্রতিরোধের ব্যবস্থাসহ প্রতিশোধের ব্যবস্থাও নিলাম তাদেরই বিরুদ্ধে যারা হতে চাইবে আমাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে উপগত।

কয়েক ডজন বিজ্ঞানীর নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টার পর ওষুধও একদিন আবিষ্কার হলো। এবার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পালা।…দেখা গেলো, আমাদের প্রকল্প সফল। আমরা বিজয়ী। হুজুর, আমরা এমন ওষুধ আবিষ্কার করেছি যা আমাদের শরীরকে আমাদের মনের নিয়ন্ত্রণে বেঁধে ফেলেছে। এবং আমাদের সেই অনিচ্ছুক শরীরের নিঃশ্বাস ওদের শরীরকেও বদলে দিচ্ছে। আমাদের বদল আমাদের নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু ওদের বদলের সুইসটি ওদের হাতে নয়। এরচেয়ে বড় আনন্দের, এরচেয়ে বড় বিজয়ের কোনো ঘটনা আমাদের হাজার হাজার প্রজন্মের নারীজীবনে আর তো নেই হুজুর।

আদালতে ফের গুঞ্জন ওঠে। ক্ষুব্ধ-অসহিষ্ণু পুরুষদের অনোন্যপায় চিৎকার শোনা যায়। হাকিম হাতুড়ি ঠোকেন। আর তখন বিজয়ের আনন্দে উল্লসিত নারীদের শ্লেষাত্মক হাসির হাহাকার আদালত কক্ষের চার দেয়াল চূর্ণ করে ছিটকে বেরিয়ে পড়ে। সেই সাথে ছিটকে পড়েন তিনিও। তার সর্বজনমান্য উচ্চাসন, তুলাদণ্ড, শিরস্ত্রাণ সব গড়াতে থাকে। গড়াতে গড়াতে তারা সরে যায় তার নাগালের বাইরে। তিনি সেগুলো কুড়িয়ে আনতে ছুটতে থাকেন। দিগ্বিদিক ছুটতে ছুটতে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যান এক বিশাল গর্তমুখে—যে গর্তে হারিয়ে গেছে তার আসন-দণ্ড-শির সকল।

গর্তটাকে তার খুব চেনা মনে হয়। মনে হয় যেনো এ গর্তের সাথে তার আজন্ম পরিচয়। ভালো করে পরখ করে দেখে তিনি চমকে ওঠেন। এ যে তার মাতৃযোনী! মাতৃভূমির যোনী! এ যোনী তার দেশমাতার!

অত্যাচার-অনাচার-অজাচার আর অবিচারে বিকৃত সেই যোনীর পাশে তিনি পড়ে থাকেন—এক অজ্ঞান-হতবুদ্ধি, হা-বিবেক বিচারক।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
copyright 2020:
Theme Customized BY MD MARUF ZAKIR