মাওলানা মাহবুব সিরাজী
পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর, সুতীক্ষ্ণ ও প্রবল তেজস্বী স্মৃতিশক্তিকে Hyperthymesia বা হাইলি সুপিরিয়র অটোবায়োগ্রাফিকাল মেমোরি (highly superior autobiographical memory – সংক্ষেপে HSAM) বলে। অবশ্য এর পাশাপাশি অসাধারণ প্রখর স্মৃতিশক্তিকে ফটোগ্রাফিক মেমোরি বলে। এরকম স্মৃতিশক্তির অধিকারী লোকের সংখ্যা সব যুগেই বিরল।
বিগত শতাব্দের যুগগ্রেষ্ঠ আলেম দারুল উলূম দেওবন্দের (৪র্থ) সদরুল মুদাররিস ইমামুল আসর আল্লামা শাহ আনওয়ার কাশ্মীরি রহ. ছিলেন বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তির অধিকারী।
প্রসিদ্ধি আছে যে, ৯০ হাজারের অধিক কিতাব তাঁর সম্পূর্ণ মুখস্থ ছিলো ; প্রয়োজন মুহূর্তে তিনি কিতাবের খণ্ড, অধ্যায়, পৃষ্ঠা এমনকি ছত্রের (লাইন) নম্বর পর্যন্ত অনায়াসে বলে দিতে পারতেন।
তিনি কোনো কিতাব এক পলক দেখলে অন্তত ত্রিশ বছর পর্যন্ত তাঁর স্মৃতিতে তা হুবহু জীবন্ত থাকতো।
একবার একটি আইনগ্রন্থের টেক্সট (عبارة -মূলপাঠ) অশুদ্ধ দেখে তিনি তার কারেকশন বা শুদ্ধ পাঠ বলে দেন। নিশ্চিত হওয়ার জন্যে বিচারক পুরাতন একটি বই ও উৎসগ্রন্থ যাচাই করে তা হুবহু পেয়ে কাশ্মীরিকে জিজ্ঞেস করলেন- আপনি এ পুস্তকটি কতদিন আগে অধ্যয়ন করেছিলেন? জবাবে তিনি বলচিলেন- মাত্র ৩০ বছর আগে।-সূত্র -The Islamic Gateway.
এই উদাহরণ থেকে তাঁর বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
উস্তাদ_কর্তৃক_তাঁর_স্মৃতিশক্তির_তুলনা:
একবার ভারতের একটি বিখ্যাত লাইব্রেরিতে আগুন লেগে সেখানকার সমস্ত পুস্তক ও প্রাচীন পাণ্ডুলিপি জ্বলে পোড়ে ছাই হয়ে যায়। তখন লোকজন যারপরনাই আফসোস করতে থাকে। কারণ, এটা ছিলো ইংরেজদের ষড়যন্ত্রেরই অংশ। তাই আশঙ্কা হচ্ছিল এমন দুর্ঘটনা দারুল উলূমের লাইব্রেরির ক্ষেত্রে ঘটলে করণীয় কী বা কী করা যেতে পারে প্রভৃতি।
তখন দারুল উলূমের নায়েবে মুহাতামিম হযরত মাওলানা হাবিবুর রহমান রহ. বলে উঠলেন, দারুল উলূমের কুতুবখানা আগুনে পোড়ে গেলেও আমার চিন্তা নেই। কারণ, আমাদের কুতুবখানার সমস্ত কিতাব মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি কমপক্ষে একবার হলেও মুতালাআ (অধ্যয়ন) করে নিয়েছেন।- নকশে দাওয়াম।
তবে এই বিস্ময়কর মেধাবী মনীষী পবিত্র কুরআনের হাফিজ হতে পারেন নি, এবং ইংরেজিও শিখতে পারেন নি! তিনি নাকি ইংরেজি ভাষার মাত্র দুটি শব্দ মুখস্থ রাখতে পেরেছিলেন। দু’টি প্রাণির নাম- একটি হালাল, একটি হারাম। শব্দ দুটো হলো fish (মাছ) এবং pig (শুকর)।
মামলার_আশ্চর্য_সাক্ষ্যদান
দুই ইংরেজের ঝগড়ার সাক্ষী হয়ে একবার নাকি তাঁকে আদালতে যেতে হয়েছিল। তিনি ইংরেজি জানতেন না, তো সাক্ষ্য দিবেন কীভাবে? কিন্তু তিনি সাক্ষ্য দিলেন এবং বিবদমান পক্ষদ্বয় অকাতরে তা মেনেও নিয়েছিলো।
ঘটনা হলো, তিনি বাড়ি থেকে দেওবন্দ ফেরার পথে কোনো এক জায়গায় দু’জন ইংরেজকে ঝগড়া ও বচসা করতে দেখেন। তখন তিনি প্রস্রাবের ভান করে অকুস্থলের আশেপাশে পায়চারি করে ঝগড়া প্রত্যক্ষ করে নিজ গন্তব্যে ফিরেন।
অর্থাৎ তখন কে কাকে কী বলেছে তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনে নিয়ে তার বিস্ময়কর মেমোরিতে তা সেট করে নিয়েছিলেন। তাই আদালতে হাজির হয়ে তিনি বললেন, মাননীয় বিচারক, আমি ইংরেজি জানি না। তাই কে কার ওপর বাকচাতুর্যে কতটুকু বাড়াবাড়ি করেছে; কে দোষী আর কে নির্দোষ আমি তা তরজমা করে বলতে পারবো না। তবে একটা বিষয় পারবো তা হলো- প্রতিপক্ষ কে কাকে উদ্দেশ্য করে কোন শব্দ ও বাক্য উচ্চারণ করেছে আমি আমার স্মৃতি থেকে হুবহু তা বলে দিতে পারবো।
আদালত তাকে এ সুযোগ দিলে তিনি তাদের ঝগড়ার বিবরণ দিতে গিয়ে প্রত্যেকের শব্দ ও বাক্য তাঁর স্মৃতি থেকে অবলীলায় হুবহু বলে দিয়ে সকলকে বিস্ময়ে হতবাক করে দেন।
তখন পক্ষদ্বয় তা স্বীকার করে নেয়, আর এভাবেই তাদের মকদ্দমার সহজ মীমাংসা ঘটে।
কিন্তু এই বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তির অধিকারী মনীষী কুরআন কারীম মুখস্থ করতে পারেন নি। কেনো পারেন নি? তার কারণ জানা যাক।
একবার_শায়খুল_ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি রাহিমাহুল্লাহ কৌতূহলবশত আল্লামা কাশ্মীরিকে জিজ্ঞেস করলে স্বয়ং কাশ্মীরি তার কারণ শায়খ মাদানীকে বলেছিলেন।
কাশ্মীরি_বলেন, হিফজ করার নিয়তে যখনই কুরআন তেলাওয়াত করতে বসি তখনই পবিত্র কুরআনের সমস্ত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিয়ষয়াদি, রহস্য, ভেদ ও মাহাত্ম্য আমার চোখের সামনে চলে আসে। তখন হিফজ করার কথা কেমনে মন থেকে চলে যায় তা ঘুনাক্ষরেও বলতে পারি না।
এজন্যে তিনি হাফিজে কুরআন হতে পারেন নি। অথচ, সমস্ত আয়াতের তাফসীরসহ তাঁর স্মৃতিতে সংরক্ষিত ছিলো লক্ষ লক্ষ হাদীস। হতে পারে এটাও আল্লাহর কুদরতের এক নমুনা।
তিনি ছিলেন উস্তাদদেরও উস্তাদ। হাকীমুল উম্মত আল্লামা শাহ আশরাফ আলী থানবী, শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী রাহিমাহুমাল্লাহর মতো মহাপুরুষেরা ইলমের সাগরে সন্তরণ করতে গিয়ে কোথাও কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে সাক্ষাৎ সমাধানদাতা ছিলেন ইমাম কাশ্মীরী রহ.।
ইসলামের_কবি_আল্লামা_ইকবাল বলেছিলেন, ইমাম ইবনে হুমামের পর বিগত পাঁচ শত বছরের মাঝে ইমাম কাশ্মীরির মতো এতো মহাজ্ঞানী ও বিস্ময়কর মেধার অধিকারী কেউ ইসলামি জগতে জন্ম গ্রহণ করে নি।
আল্লাহ পাক কাশ্মীরিসহ আমাদের সকল আকাবির আসলাফের কবরকে নূর দ্বারা ভরপুর করে দিন।
