সালমা খাতুন: স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বহু সংগ্রামীদের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, কিন্তু সেখানে মুসলিম সংগ্রামীদের নাম খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। গুটিকতক পুরুষদের নাম পাওয়া গেলেও মুসলিম নারীদের নাম হারিয়ে গেছে ইতিহাসের পাতা থেকে। স্বাধীনতা সংগ্রামে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অবদানও অনস্বীকার্য। বহু মুসলিম নারী সংসার সামলানোর পাশাপাশি ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
বেগম হযরত মহল:
নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের পত্নি। স্বামী কলকাতায় নির্বাচিত হওয়ার পর রাজ্যের দায়িত্বভার নিজের হাতে তুলে নেন। স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধে ভারতের অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তিনি প্রথম সারিতে থেকেছেন। হেনরি লরেন্স সহ অন্যান্য রাজকর্মচারীদেরকে তিনি পরাস্ত করেন। স্যার হেনরি লরেন্সকে তিনি গুলি করে হত্যা করেন। এছাড়াও জেনারেল হাভলক ইংরেজ সৈন্য নিয়েও ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে স্যার ক্যাম্পবেল লখনউ পদানত করতে সক্ষম হন। তাকে সন্ধি
করতে বাধ্য করা হয়। তিনি ব্রিটিশদের সমস্ত শর্ত নাকচ করে ব্রিটিশ সৈন্যদের হাত থেকে পালিয়ে যেতে সমর্থ হন। বাকি জীবন তিনি নেপালের কাঠমান্ডুতে কাটিয়ে দেন।
বাই আম্মা (আবেদি বেগম):
প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী ভ্রাতৃদ্ধয় সওকাত আলি ও মুহাম্মদ আলির জননী ছিলেন। ১৯২১-এর ডিসেম্বরে তার সন্তানদের বন্দিত্বের সংবাদ খুশি মনে গ্রহণ করেন। গুজব ছড়িয়েছিল যে তার পুত্র মুহাম্মদ আইল রাজাভিক্ষায় জেল থেকে ছাড়া
পেয়েছেন, তখন তিনি বলেছিলেন-‘মুহাম্মদ আলি ইসলামের পুত্র, সে কখনোই ক্ষমা ভিক্ষা চাইতে পারে না। যদি সে এটা করে থাকে, তাহলে আমার বুড়ো হাত তাকে দমন করা জন্য যথেষ্ট।’ তিনি নিজে চরকায় কাটা সুতার পোষাক পরতেন এবং অন্যদেরকেও খাদি পরতে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির জন্য কঠোর, পরিশ্রম করেন এবং এটাকে তিনি ঈমানের অঙ্গ বলে মনে করতেন।
মিসেস জুবাইদা দাউদি:
মাওলানা সাফি দাউদির স্ত্রী ছিলেন।
তিনি প্রাণপণে ব্রিটিশদের বিরোধিতা করেছিলেন এবং অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। তিনি তার স্বামী, আত্মীয়-স্বজন এবং অন্যান্যদের কাছ থেকে সমস্ত বিদেশি জামাকাপড় সংগ্রহ করে কংগ্রেস অফিসে নিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন জনসমাবেশে অংশগ্রহণ করতেন এবং মহিলাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করতেন। যখন স্কুল-কলেজের ছাত্ররা সরকারী স্কুল ছেড়ে দিচ্ছিল, তখন মাওলানা সাফি দাউদি একটি স্কুল চালু
করেন। জুবাইদা দাউদি সেখানে ছাত্রদের দেখাশোনা করতেন এবং তাদের উৎসাহ দিতেন স্বাধীনতা সংগ্রামে।
এছাড়াও আসগারি বেগম, মাজিরা খাতুন, রাজিয়া খাতুন, জামিরা, লেডি মুহাম্মদ সফি, খাদিমা বেগম, বেগম হাবিবুল্লা প্রমুখ মুসলিম নারী স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। পুরুষতান্ত্রিক নীতিহীন সমাজ এইসব মহিয়সী নারীদের তাদের প্রাপ্য মর্যাদা না দিলেও, এদের কাহিনী চেপে রাখতে পারেনি আর সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না।
