ঢাকা, ২৩ ডিসেম্বর:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও শতবর্ষী ইসলামী রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-এর মধ্যে চারটি আসনে যে সমঝোতা হয়েছে, তা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুমাত্রিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি যখন জোট রাজনীতিতে সাধারণত আসন ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘সংযত’ ও ‘হিসেবি’ অবস্থান নিচ্ছে, ঠিক সে সময় একটি দলকে চারটি পূর্ণ আসন ছেড়ে দেওয়া রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) সকালে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, সমঝোতাকৃত আসনগুলোতে বিএনপির কোনো প্রার্থী থাকবে না এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থীরা নিজস্ব প্রতীক ‘খেজুর গাছ’ নিয়ে নির্বাচন করবেন।
মির্জা ফখরুল বলেন,
“জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ আমাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি।”
রাজনৈতিকভাবে চারটি আসনই আলাদা গুরুত্ব বহন করে—
-
নীলফামারী-১ (রংপুর অঞ্চল):
উত্তরবঙ্গে কওমি মাদরাসাভিত্তিক আলেম সমাজ ও গ্রামীণ ভোটব্যাংক শক্তিশালী। জমিয়তের মহাসচিব মাওলানা মনজুরুল ইসলাম আফেন্দীর নিজ এলাকা হওয়ায় সাংগঠনিক ভিত্তি দৃঢ়। -
নারায়ণগঞ্জ-৪:
শিল্পাঞ্চল ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ধর্মীয় বলয়ের শক্ত উপস্থিতি রয়েছে। মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী এখানে পরিচিত মুখ। -
সিলেট-৫:
সিলেট অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে আলেম-উলামা অধ্যুষিত। জমিয়তের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের জন্য এটি কৌশলগত আসন। -
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২:
কওমি মাদরাসা ও ধর্মীয় রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব এখানে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপি সাধারণত ছোট দলগুলোকে প্রতীকী বা এক-দুটি আসনের বেশি ছাড় দেয় না। সেখানে জমিয়তকে চারটি আসন দেওয়া কয়েকটি কারণে সম্ভব হয়েছে—
-
জমিয়তের শতবর্ষী ঐতিহাসিক পরিচয়
-
বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘ জোট অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনের সঙ্গী হওয়া
-
কওমি আলেম সমাজে জমিয়তের প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক
-
ইসলামপন্থী ভোট বিভাজন রোধের কৌশল
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভাষায়,
“এটি শুধু আসন ছাড় নয়, বরং বিএনপির পক্ষ থেকে ইসলামি ধারার রাজনীতিকে একটি ‘রেসপেক্টফুল স্পেস’ দেওয়ার কৌশল।”
২০২১ সালের ১৪ জুলাই জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ছাড়ে। তখন দলটি অভিযোগ তোলে—
-
ইসলামি মূল্যবোধের প্রতি বিএনপির অনাগ্রহ
-
জোট শরিক হিসেবে যথাযথ মূল্যায়নের অভাব
-
নীতিগত বিষয়ে মতামত উপেক্ষা
এরপর জমিয়ত সমমনা ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের চেষ্টা করলেও তা বাস্তব রূপ পায়নি।
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তারা বর্জন করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যায়। নতুন সরকারের অধীনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর বিএনপি আবারও পুরোনো মিত্রদের সঙ্গে বোঝাপড়ায় আগ্রহী হয়। এই প্রেক্ষাপটেই জমিয়তের সঙ্গে পুনরায় আসন সমঝোতা।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মনজুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন,
“জমিয়ত শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাসের অংশ।”
বর্তমানে—
-
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত (নিবন্ধন নং ২৩)
-
সভাপতি: মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক
-
মহাসচিব: মাওলানা মনজুরুল ইসলাম আফেন্দী
-
সহযোগী সংগঠন: ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ, যুব জমিয়ত বাংলাদেশ
উত্তরবঙ্গ, সিলেট, ময়মনসিংহসহ সারাদেশে রয়েছে দলটির সাংগঠনিক বিস্তার।
এই সমঝোতা থেকে যে বার্তাগুলো স্পষ্ট—
-
বিএনপি ইসলামপন্থী শক্তিকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে চায় না
-
জমিয়ত আবার মূলধারার নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয়
-
ইসলামি ভোটব্যাংক ঐক্যবদ্ধ রাখার কৌশল জোরদার
চারটি আসনের এই সমঝোতা সংখ্যায় ছোট হলেও রাজনৈতিকভাবে বড় ইঙ্গিতবাহী। এটি শুধু বিএনপি–জমিয়তের সম্পর্ক পুনর্গঠন নয়, বরং আগামী নির্বাচনে ইসলামি ধারার রাজনীতির ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
