– সৈয়দ মবনু
ভূমিকা:
ইসলামী ঐক্য আর জাতীয় ঐক্য-কোনটার বিরোধী আমরা নয়। আমরা অপরিকল্পিত এবং অতি-আবেগী কাজের বিরোধী। কারণ অপরিকল্পিত এবং অতি-আবেগী কর্ম লাভ থেকে ক্ষতি বেশি করে। এদেশে যতটা ইসলামী দল রয়েছে তার মধ্যে বেশিরভাগই ঐক্যের প্লাটফর্ম থেকে বিশেষ গোষ্ঠীর দল হয়েছে। জমিয়ত, জামায়াত, খেলাফত, নেজামে ইসলাম, শাসনতন্ত্র, ঐক্যজোট, হেফাজত ইত্যাদির জন্মবৃত্তান্ত পড়লে আমার বক্তব্যের সত্যতা পেয়ে যাবেন। তাই আমাদের ভয় নতুন ঐক্য মানে আরেকটি নতুন দলের অভিষেক নয় তো?
* নির্বাচন এবং ইসলামী দল
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠে ইসলামী দলগুলোর সংখ্যা ও ধরন বৃদ্ধি পেয়েছে।
১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অধীনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র দুইটি ইসলামী দল বা জোট অংশগ্রহণ করেছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের অধীনে নির্বাচনে ইসলামী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান হযরত মুহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (র.)। তিনি ব্যাপক ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। এরপর হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদের ১১ বছরের সামরিক শাসন, যা ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ শেষ হয়। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে মোট ১৭টি ইসলামী দল ভোটের ময়দানে অংশ নেয়, ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে তা বেড়ে ১৮টি এবং ২০২১ সালে ১১টি দল নির্বাচনী মাঠে দেখা যায়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ থেকে ২০২১ পর্যন্ত ৩৫টি ইসলামী দল নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেছে। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১২টি নিবন্ধিত দল ছিল। বর্তমানে অনুমানিক ৫০টি নিবন্ধিত দল রয়েছে।
* রাজনৈতিক প্রভাব বনাম নির্বাচনি শক্তি
ইসলামী দলগুলো ধরণভিত্তিকভাবে শাস্ত্রভিত্তিক, আদর্শিক-নিষ্ঠ বা পীর-কেন্দ্রিক। পীর-কেন্দ্রিক দলগুলো গ্রাসরুট ভিত্তি তৈরি করেছে, কিন্তু দেশব্যাপী রাজনৈতিক শক্তি সীমিত। জামায়াতে ইসলামী কর্পোরেট কাঠামোর মাধ্যমে শক্তিশালী হলেও ভোটের ময়দানে দুর্বল। ইসলামী ঐক্যজোট এক সময় শক্তিশালী হলেও বর্তমানে কার্যত শূন্যে।
কারণ, সাধারণ জনগণ ধর্মকে জীবনবিধি হিসেবে নয়, বরং “civil religion” হিসেবে গ্রহণ করেছে। যা এক ধরনের নৈতিক দায়বদ্ধতা, গর্ব ও রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের মাধ্যম। যদিও এটি সামাজিক সংহতি বাড়ায়, তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় তেমন কার্যকর নয়। তাই বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে তাদের সাফল্য সীমিত। গবেষণায় দেখা গেছে, নীতি ও এজেন্ডা প্রচারে তারা কার্যকর হলেও ভোটারদের দলীয় নির্বাচনে প্রভাবিত করতে পারছে না। নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে যারা নির্বাচনী ও রাজনৈতিক মঞ্চে ঐক্যের শক্তি অর্জনের চেষ্টা করছেন, তারা সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ঘাটে ঘাটে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে যাদের কাছে কিছু পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় সেই জামায়াতের ক্যাডারভিত্তিক মনোভাব এবং লুকোচুরি নীতি বাকী দলগুলোর আস্থা কমিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা এবং সাহাবা সমালোচনার অভিযোগগুলোও তাদের ঐক্য ও গ্রহণযোগ্যতা বাধাগ্রস্ত করছে। এই বিষয়গুলো যদি তারা স্পষ্টভাবে সমাধান করতে পারে, তবে তাদেরকে নিয়ে বড় একটি ঐক্য সম্ভব। সমাধান না হলে মিছিল করলেও ঐক্য হবে বলে মনে হয় না।
* ঐক্য এবং ভবিষ্যত রোডম্যাপ
আবেগ-নির্ভর ঐক্য সাময়িকভাবে দৃশ্যমান হলেও টেকসই হয় না। স্থায়ী ঐক্যের জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ। আমাদের সুপারিশগুলো এক্ষেত্রে কিছু কার্যকর হতে পারে—
১. সর্বনিম্ন সাধারণ এজেন্ডা: সংবিধান, শিক্ষা, নৈতিকতা, দুর্নীতিবিরোধিতা ইত্যাদি বিষয়ে ঐক্যমত তৈরি।
২. কাউন্সিলভিত্তিক নেতৃত্ব: একাধিক দলের মতামত শীর্ষ নেতৃত্বে ভাগাভাগি করা, যাতে কোনো এক ব্যক্তি বা দলের আধিপত্য তৈরি না হয়।
৩. সংগঠন ও জনআস্থা: সামাজিক ও সেবা সংগঠন, গ্রাসরুট উপস্থিতি এবং জনমত অর্জনের পরিকল্পনা।
৪. মতাদর্শিক বিভাজন কাটানো: ঐক্যকে স্বল্পমেয়াদী স্লোগান নয়, বাস্তব কর্মসূচিতে রূপান্তর করা।
৫. আধুনিক প্রেক্ষাপটে অভিযোজন: রাজনৈতিক শূন্যস্থান, ছাত্র আন্দোলন, আধিপরিকোপনা—এ ধরনের পরিস্থিতি সামলানোর মানসিক ও কার্যকর পরিকল্পনা।
এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য একটি দক্ষ, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
* উপসংহার
বাংলাদেশে ইসলামী রাজনৈতিক দলসমূহের সংখ্যা ও ধরন বৈচিত্র্যময় হলেও তাদের নির্বাচনি শক্তি সীমিত। তবে আধুনিক রাজনৈতিক শূন্যস্থান ও সামাজিক পরিবর্তনের সময়ে পরিকল্পিত ঐক্য ও সংগঠিত কর্মপরিকল্পনা যথাযথভাবে প্রয়োগ করলে তারা নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেন। নইলে ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা নিছক আবেগের সীমায় আটকে থাকবে।
