— সৈয়দ মবনু
ইসলামী ঐক্যের প্রসঙ্গ উঠলেই অনেকে আজকাল নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরির কথা বলেন। অথচ বাস্তবে আমাদের সমাজে হেফাজতে ইসলামের মতো একটি শক্তিশালী ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম ইতিমধ্যেই বিদ্যমান। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের আন্দোলনের পর থেকেই তারা ইসলাম রক্ষার জন্য দেশের আলেম-ওলামাকে একত্রিত করে রেখেছেন। প্রশ্ন হলো— আবার নতুন করে ঐক্যের নামে ভিন্ন কোনো সংগঠন তৈরির প্রয়োজন কেন?
আমি যখন এই প্রশ্ন তুললাম, তখন অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন— “হেফাজত কি কোনো রাজনৈতিক দল?”
তাদের এই ক্ষোভের জবাবে কয়েকটি প্রশ্ন ও বিশ্লেষণ আমি হাজির করছি—পাঠক বিবেচনা করবেন;
প্রশ্ন ১. আপনাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী?
যারা হেফাজতকে রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক তকমা দেন, তাদের নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানই বা কী?
নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে হেফাজতের সমালোচনা করা আসলে দ্বিমুখী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। যদি রাজনীতি করা দোষ হয়, তবে অন্যরা করলে সেটাও দোষ। আর যদি ইসলাম রক্ষার জন্য রাজনীতি করাই অপরিহার্য হয়, তবে হেফাজতের সমালোচনার জায়গা কোথায়?
প্রশ্ন ২. ইসলাম আর রাজনীতি— আলাদা করার মানদণ্ড কী?
একটি সংগঠন ইসলামী হবে কোন বৈশিষ্ট্যে আর রাজনৈতিক হবে কোন বৈশিষ্ট্যে?
হেফাজতে ইসলামের দাবি, তারা ইসলাম রক্ষার জন্য কাজ করছে। তাহলে এটা কেবল ইসলামি কাজ নাকি রাজনৈতিক? বাস্তবতা হলো, ইসলামকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখার মানসিকতা ইসলামি চিন্তাধারার সঙ্গে যায় না। ইসলাম তো পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা— যেখানে রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি সবই অন্তর্ভুক্ত।
প্রশ্ন ৩. ২০১৩ থেকে যে ঐক্যের কাজ শুরু হয়েছে, সেটি অকার্যকর হলো কেন?
যদি ইসলাম রক্ষার জন্যই ঐক্য চান, তবে হেফাজতের প্ল্যাটফর্ম দিয়েই তো তা সম্ভব।
২০১৩ খ্রিস্টাব্দে তারা যে আন্দোলন চালিয়েছেন, সেটাই প্রমাণ করে আলেমরা ঐক্যবদ্ধ হলে কী শক্তি তৈরি হয়। তাহলে পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন করে শুরু করার যুক্তি কোথায়?
বরং ঐক্যের মূল চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত ভাঙন রোধ করা, নতুন ভাঙন সৃষ্টি করা নয়।
প্রশ্ন ৪. নিবন্ধন প্রসঙ্গ?
অনেকে বলেন— “হেফাজতের তো কোনো নিবন্ধন নেই।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো— নতুন যে ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চান, তার কি ইতিমধ্যেই নিবন্ধন হয়ে গেছে?
আসলে নিবন্ধনের প্রশ্নটা অজুহাত মাত্র। ইসলাম রক্ষার ঐক্যে নিবন্ধন কি চূড়ান্ত শর্ত হতে পারে?
প্রশ্ন ৫. আলেমদের নেতৃত্বে ভয় কারা পান?
কিছু মহল যুক্তি দেন— “হেফাজত হলে মাদরাসার মুহতামীম আর মসজিদের খতিবদের ক্ষমতা বেড়ে যাবে।”
তাহলে প্রশ্ন জাগে— আলেমদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেলে যে ইসলাম ভয় পায়, সেটা কোন ইসলাম?
আসল ইসলাম তো আলেমদের নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দেয়। কোরআন-হাদিসের আলোকে আলেমরা উম্মাহর উত্তরাধিকারী। সুতরাং তাদের নেতৃত্বকে ভয় দেখানো মানেই অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ইসলামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা।
প্রশ্ন ৬. নতুন ঐক্যের ফর্মুলা কী?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— যারা হেফাজতের বাইরে গিয়ে নতুন ঐক্যের স্বপ্ন দেখছেন, তারা কি জনগণের সামনে স্পষ্ট করে বলতে পারবেন তাদের নতুন ঐক্যের ফর্মুলা কী?
লক্ষ্য কী? উদ্দেশ্য কী?
নাকি পুরোনো ঐক্যকে ভাঙার জন্যই নতুন ঐক্যের আয়োজন? যদি তাই হয়, তবে সেটা ঐক্যের নাম করে বিভক্তি তৈরির চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।
উপসংহার: ইসলামী ঐক্য মানে শক্তি বৃদ্ধি, বিভাজন নয়। হেফাজতে ইসলাম নামক প্ল্যাটফর্মটি আমাদের সামনে একটি পরীক্ষিত ও বাস্তব উদাহরণ।
প্রশ্ন হচ্ছে— আমরা কি সত্যিই ঐক্য চাই? নাকি ঐক্যের আড়ালে নতুন বিভাজনের রাজনীতি করতে চাই?
সত্যিকারের ঐক্য আলেমদের নেতৃত্বেই আসবে, কাগুজে আর প্ল্যাটফর্মে নয়।
