— সৈয়দ মবনু
১. ভূমিকা
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে ইসলামী রাজনীতির বড় সংকট হলো—নেতাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সংসদে প্রবেশ করা, এমপি বা মন্ত্রী হওয়া। অথচ ইসলামী রাজনীতির মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর নির্দেশে ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, সমাজ সংস্কার এবং মানুষের নৈতিক উৎকর্ষ সাধন। উদ্দেশ্য যখন ক্ষমতার কুর্সিতে সীমাবদ্ধ হয়, তখন ইসলামী আন্দোলন তার মৌলিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়।
২. ক্যাডার ভিত্তিক রাজনীতির উৎপত্তি
ভারতবর্ষে ক্যাডার ভিত্তিক রাজনীতির সূচনা হয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের মাধ্যমে। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম শৃঙ্খলাবদ্ধ ক্যাডার গঠন করতে ব্যর্থ হলেও মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী পাকিস্তান সৃষ্টির পর ইসলামী আন্দোলনে ক্যাডারভিত্তিক কাঠামো প্রবর্তন করেন (খুরশীদ আহমদ, ১৯৭০)। এর উদ্দেশ্য ছিল একটি আদর্শনিষ্ঠ, নিয়ন্ত্রিত কর্মীবাহিনী তৈরি করা। কিন্তু কমিউনিস্ট কাঠামো অনুকরণ করার কারণে ইসলামী আন্দোলনও রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখতে শুরু করে। এখানেই প্রথম আদর্শ ও কৌশলের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
৩. নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ ও আদর্শচ্যুতির সূচনা
১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে আইয়ুব খানের তথাকথিত “মৌলিক গণতন্ত্র”-এর আওতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। ফাতেমা জিন্না বনাম আইয়ুব খান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জামায়াতে ইসলামি অংশ নিল ফাতেমা জিন্নার পক্ষে (ওয়াহিদুজ্জামান খান, ১৯৮৪)।
এই অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে ভোটকেন্দ্রিক মানসিকতার সূচনা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে (ওয়াহিদুজ্জামান খান, ১৯৮৪; আলী রেজা, ১৯৯৫), এটি ছিল ইসলামী আন্দোলনের প্রথম বড় ধরনের আদর্শচ্যুতি, কারণ এখানে আদর্শের প্রশ্ন নয় বরং নির্বাচনী জয়ের কৌশল প্রাধান্য পেল। তখন এর প্রতিবাদ করে ডা. ইসরার আহমদ জামায়াতের রাজনীতি থেকে পদত্যাগ করেন। ডা. ইসরার আহমদের মতে মাওলানা মওদূদীর হাতেই জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে প্রথম আদর্শচ্যূতি ঘটে।
৪. হাফেজ্জী হুজুর ও তাওবার রাজনীতি
১৯৮০-এর দশকে হযরত মুহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর এক নতুন ধারণা নিয়ে আসেন—“তাওবার রাজনীতি”। তাঁর মতে, ইসলামী রাজনীতির ভিত্তি হতে হবে আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক পরিবর্তন। এজন্য তিনি গড়ে তোলেন খেলাফত সংগ্রাম পরিষদ।
হযরত হাফেজ্জী হুজুরের রাজনৈতিক দর্শনে বলা হয়েছিল:
“ইসলামী রাজনীতির উদ্দেশ্য মন্ত্রী বা এমপি হওয়া নয়, বরং মানুষকে তাওবার পথে ফিরিয়ে আনা এবং সমাজকে আল্লাহভীরু করা।” (হাফেজ্জী, ১৯৮৭)
তবে তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরসূরিরা এই নৈতিক রাজনীতিকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। তারাও সংসদীয় রাজনীতির প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েন।
৫. বিপ্লবী রাজনীতির স্বপ্ন ও বিভ্রান্তি
এক অংশ ইসলামী কর্মী “বিপ্লবী রাজনীতি”র স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, হঠাৎ বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামী শাসন কায়েম হবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—কোনো বিপ্লব সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রস্তুতি ছাড়া সফল হয়নি (এরিক হবসবম, ১৯৬২)।
ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, কিংবা ইরানের খোমনীর শিয়া বিপ্লব—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি, সংগঠন, শিক্ষা ও নৈতিক ভিত্তি ছিল। ইরানে আয়াতুল্লাহ খোমেইনীর নেতৃত্বে সফল বিপ্লব হয়েছিল কারণ ধর্মীয় নেটওয়ার্ক ও জনগণ দীর্ঘ প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে তৈরি ছিল। (আব্রাহামিয়ান, ১৯৮২; আলগার, ১৯৮৩)।
বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন সেই প্রস্তুতি ছাড়াই বিপ্লবের স্বপ্ন দেখায় বিভ্রান্ত হয়েছে এবং ব্যর্থতার মুখে পড়েছে।
৬. উপসংহার
ইসলামী রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল আদর্শ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ভোটকেন্দ্রিক রাজনীতি ইসলামী আন্দোলনকে বারবার আদর্শচ্যুত করেছে, আবার অপরিকল্পিত বিপ্লবের স্বপ্ন বিভ্রান্ত করেছে।
বর্তমানে ইসলামী রাজনীতির সামনে তিনটি পথ—
১. সংসদীয় রাজনীতির মোহ (আদর্শচ্যুতির পথ),
২. বিপ্লবের বিভ্রান্তি (অপরিকল্পিত স্বপ্ন),
৩. আত্মশুদ্ধি ও তাওবার রাজনীতি (টেকসই ইসলামী পথ)।
অবশেষে আমাদের কথা হলো; হযরত হাফেজ্জী হুজুর (র.) যে নৈতিক রাজনীতির দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেটিই ইসলামী আন্দোলনের জন্য কার্যকর ও টেকসই পথ হতে পারে এবং এই পথেই ইসলাম ও মুসলমানদের মঙ্গল।
