নয়াদিল্লি, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫:
দেশজুড়ে আলোচিত ওয়াকফ সংশোধনী আইন ২০২৫ নিয়ে আজ সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক অন্তর্বর্তীকালীন রায় দিয়েছে। প্রধান বিচারপতি বি.আর. গাভাইয়ের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বেঞ্চ আইনটির তিনটি অত্যন্ত বিতর্কিত ধারা স্থগিত করেছে। তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, আইনটির সম্পূর্ণ অবৈধতা বা বাতিলের ভিত্তি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
—
কোন ধারাগুলি স্থগিত হলো:
১. ওয়াকফ করার যোগ্যতা সীমিতকরণ ধারা
নতুন আইনে বলা হয়েছিল, গত পাঁচ বছর ধরে ইসলাম ধর্ম পালনকারী ব্যক্তিরাই কেবল ওয়াকফ করতে পারবেন। আদালত এই বিধান স্থগিত করে জানিয়েছে, রাজ্য সরকারগুলো যতদিন পর্যন্ত এ বিষয়ে নিয়ম প্রণয়ন না করবে ততদিন এই ধারা কার্যকর হবে না।
২. জেলা কালেক্টরের পূর্ণ ক্ষমতা ধারা
আইনটি কালেক্টরদের এমন ক্ষমতা দিয়েছিল যাতে তারা বিতর্কিত সম্পত্তি ওয়াকফ কিনা তা এককভাবে নির্ধারণ করতে পারতেন। আদালত জানিয়েছে, ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের রায় না আসা পর্যন্ত কালেক্টররা ওয়াকফ সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। কোনো পক্ষ তৃতীয় পক্ষের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরও করতে পারবে না।
৩. ওয়াকফ কাউন্সিল ও বোর্ডে অমুসলিম সদস্যদের সংখ্যা সীমিতকরণ ধারা
আদালত কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলে সর্বাধিক চারজন অমুসলিম সদস্য এবং রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডে সর্বাধিক তিনজন অমুসলিম সদস্য রাখার নির্দেশ দিয়েছে। তবে আদালত অমুসলিম সিইও নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দেয়নি, বরং যতটা সম্ভব মুসলিম সিইও নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছে।
—
আদালতের মন্তব্য:
প্রধান বিচারপতি বি.আর. গাভাই বলেন, আদালত কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই কোনো আইন স্থগিত বা বাতিল করতে পারে। আবেদনকারীরা পুরো আইনকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, তবে কিছু ধারার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আদালত আরও নির্দেশ দেয় যে ওয়াকফ সংক্রান্ত বিতর্কিত সম্পত্তির ক্ষেত্রে কমিশনার বা কালেক্টরকে মালিকানা নির্ধারণের অধিকার দেওয়া যাবে না।
—
জমিয়তে উলামা-ই-হিন্দের প্রতিক্রিয়া:
রায়ের পর সংগঠনের সভাপতি মাওলানা আরশাদ মাদানী বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট দেশজুড়ে মুসলমানদের উদ্বেগ উপলব্ধি করেছে এবং তিনটি ধারায় স্থগিতাদেশ দিয়েছে। যদিও আমরা আরও স্বস্তি আশা করেছিলাম, এই রায় আমাদের লড়াইকে শক্তিশালী করেছে।”
তিনি বলেন, “ওয়াকফ ব্যবহারকারীদের আইনের বাইরে রাখা ইসলামী নীতির পরিপন্থী এবং শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার শামিল। মসজিদ, খানকাহ ও কবরস্থানের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ওয়াকফ ব্যবহারকারীদের আইনি স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি।”
মাওলানা মাদানী নতুন আইনকে দেশের সংবিধানবিরোধী আখ্যা দিয়ে বলেন, “এই আইন সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ করার বিপজ্জনক ষড়যন্ত্র। এটি শুধু মুসলমানদের নয়, ভারতের গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের উপর সরাসরি আঘাত।”
তিনি আরও জানান, “জমিয়তে উলামা-ই-হিন্দ এই কালো আইন বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আদালত ও জনমত গড়ে তোলার মাধ্যমে আইনি ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।”
—
আইনি লড়াইয়ের পেছনের প্রেক্ষাপট:
জমিয়তে উলামা-ই-হিন্দ, বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন ও ব্যক্তিরা ওয়াকফ সংশোধনী আইনকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যায়।
২২ মে ২০২৫ তারিখে আদালত এ বিষয়ে বিস্তারিত শুনানি শেষে রায় সংরক্ষণ করে।
আজকের অন্তর্বর্তীকালীন রায় সেই শুনানির পরিপ্রেক্ষিতেই দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনের পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট কপিল সিব্বল যুক্তি তুলে ধরেন।
—
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা:
রায়ের পর আইন বিশেষজ্ঞদের মত, সুপ্রিম কোর্টের এই অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ সংশোধনী আইনের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণে একটি বড় ভূমিকা রাখবে। জমিয়তে উলামা-ই-হিন্দের দাবি, তারা শেষ পর্যন্ত এই আইন বাতিল করাতে সক্ষম হবে।
