ঢাকা, ১৮ সেপ্টেম্বর (সংবাদদাতা):
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও উৎসবমুখর জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বৃহস্পতিবার রাজধানীতে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা ইতোমধ্যেই নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেছি। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ফেব্রুয়ারির শুরুতে, রমজানের ঠিক আগে।”
নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানান সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য অনুপস্থিতি এবং বিএনপির সীমিত ভূমিকার কারণে ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের সামনে তুলে ধরতে চাইছে। তারা এক ছাতার নিচে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিকল্পনা করছে।
জামায়াত থেকে দূরত্ব
তবে অধিকাংশ ইসলামি দল স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা জোট করতে আগ্রহী নয়। ঐতিহাসিক, মতাদর্শিক ও কৌশলগত কারণে এই দূরত্ব তৈরির ব্যাখ্যা দিচ্ছেন এসব দলের নেতারা। তারা বলছেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্কিত একটি নাম, যার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
জমিয়তের স্পষ্ট অবস্থান
বাংলাদেশের প্রাচীনতম ইসলামি রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। দলটির মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত জাতীয় উলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে বলেন:
> “আমাদের কনসেপ্ট পরিষ্কার। আমরা ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হতে চাই, তবে কোনো ভ্রান্তমতাদর্শের সঙ্গে আপস করতে রাজি নই। কোনো ভ্রান্তমতাদর্শের বিরোধিতা করতে গিয়ে ফ্যাসিবাদের কোলে উঠতেও রাজি নই।”
তিনি আরও বলেন,
> “যদি একান্তই কারো সঙ্গে জোট করতে হয়, তাহলে চেষ্টা করব আমাদের সার্কেলের, আমাদের এক ও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মতাদর্শের যারা, তাদের সঙ্গে মিট করার। সেক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে যেখানে ক্ষতির মাত্রা কম, সেখানে যাব। যেখানে ক্ষতির মাত্রা বেশি, সেখানে যাব না।”
নবী ও সাহাবায়ে কেরাম বিষয়ে জমিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করে আফেন্দী বলেন,
> “আমরা বিশ্বাস করি নবীগণ নিষ্পাপ। নবী হওয়ার আগে পরে দুই সময়েই তারা নিষ্পাপ। আমরা অনুরূপভাবে সাহাবায়ে কেরামকে সত্যের মাপকাটি মনে করি।”
সম্মেলনের চিত্র
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা খলিল আহমদ কুরাইশী, হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান, জমিয়তে উলামা বাংলাদেশের আমির শায়খুল হাদিস মাওলানা আলিমুদ্দীন দুর্লভপুরি ও বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হকসহ দেশের শীর্ষ আলেমরা।
উলামারা ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা, সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসলামি দলগুলোর অবস্থান বিষয়ে মতবিনিময় করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য অনুপস্থিতি ও বিএনপির দুর্বল অবস্থান ইসলামি দলগুলোকে নতুন করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ দিয়েছে। তবে জামায়াত থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ঐক্য গড়া কতটা সফল হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
অনেকে মনে করছেন, এই উদ্যোগ সফল হলে ইসলামি রাজনৈতিক শক্তি প্রথমবারের মতো একটি বড় ব্লক হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, ছোট ছোট ইসলামি দলের মধ্যে নেতৃত্ব ও আদর্শগত বিভাজন থাকায় স্থায়ী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হতে পারে।
প্রেক্ষাপট
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম উপমহাদেশে ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দলটি ভিন্ন ভিন্ন সময় বিভিন্ন জোটে অংশ নিলেও জামায়াতের সঙ্গে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব বরাবরই ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে তারা “মধ্যপন্থা” অবলম্বন করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে চায়।
সমাপ্তি
প্রধান উপদেষ্টা ইতোমধ্যে নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করায় সব দলই এখন প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত। ইসলামি দলগুলোর ঐক্য প্রচেষ্টা ভোটের মাঠে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে সবকিছু নির্ভর করছে ঐক্য কতটা বাস্তবায়িত হয়, কোন নেতৃত্ব সামনে আসে এবং জামায়াতের বাইরে থেকেও কতটা সমন্বয় সম্ভব হয় তার ওপর।
