— সৈয়দ মবনু
ভূমিকা
ভারতবর্ষের আধুনিক ইতিহাসে দেওবন্দী চিন্তাধারা শুধু ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ঔপনিবেশিক বিরোধিতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজসংস্কার এবং রাজনৈতিক আন্দোলনেও এর অবদান অনস্বীকার্য। এই চিন্তাধারার প্রাতিষ্ঠানিক প্রথম রূপ হলো জমিয়তুল আনসার, যা ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে দারুল উলূম দেওবন্দে শায়খুলহিন্দ মাহমুদ হাসান (র.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। পরে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তা হয় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ থেকে একটি অংশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নাম ধারণ করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তান জমিয়ত কিছুদিন নেজামে ইসলাম নামে রাজনীতিতে সক্রিয় হয় এবং
স্বাধীনতা উত্তর প্রথম নির্বাচনে নেজামে ইসলাম ৩৬টি আসন লাভ করে। মোটকথা হলো জমিয়ত এবং এর উত্তরসূরি সংগঠনগুলো এখনও সক্রিয় রয়েছে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে।
কেউ কেউ আজকাল ইতিহাসের যোগসূত্র তৈরি করতে না পেরে বা সমসাময়িক কারণে প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে বলেন যে, ‘অধিকাংশ দেওবন্দী আলেম কখনো জমিয়তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।’
তাদের এই বক্তব্য ঐতিহাসিকভাবে সত্য নয়, বরং বহু দলিল ইঙ্গিত করে যে জমিয়ত ও দেওবন্দ মূলত একই ধারার সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রকাশ।
* দেওবন্দিয়াত ও জমিয়তের সম্পর্ক
দেওবন্দিয়াত হলো ইসলামী সমাজব্যবস্থা, আত্মশুদ্ধি, জাতীয় স্বাধীনতা ও ঔপনিবেশিক বিরোধী রাজনীতির সম্মিলিত দার্শনিক ধারা। জমিয়তকে দেখা যায় তার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সম্প্রসারণ হিসেবে।²
অতএব, জমিয়তের বাইরে দেওবন্দিয়াতকে এবং দেওবন্দিয়াতের বাইরে জমিয়তকে কল্পনা করা ইতিহাসের সঙ্গে অসঙ্গত।
* জমিয়ত থেকে উদ্ভূত রাজনৈতিক ধারা
উপমহাদেশের বহু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলনের শেকড় জমিয়তের ভেতরে নিহিত—
১. জামায়াতে ইসলামী : প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আ‘লা মওদূদী আল-জমিয়ত পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং সরাসরি শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানীর অধীনে কাজ করেন।³
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক গোলাম আযম তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন যে,তিনি প্রথম দ্বীন শিক্ষা পেয়েছিলেন তাবলিগ জামায়াত থেকে, যা মূলত দেওবন্দী চিন্তার একটি অরাজনৈতিক শাখা।⁴
২. ফুলতলির পীর সাহেব মাওলানা আব্দুল লতিফ ফুলতলি (র.) ছিলেন জমিয়তের আসাম প্রদেশের সেক্রেটারি। চরমোনাই তরিকার শেকড় হলেন উজানীর পীর সাহেব কারী ইব্রাহিম (র.)৷ যিনি শিষ্য ছিলেন দেওবন্দের দ্বিতীয় মুহতামীম মাওলানা রশিদ আহমদ গঙ্গুহী (র.)-এর।⁵
৩. আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন শায়খুল ইসলাম সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানী (র.) এর বিশেষ খাদেম।
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও দ্বিতীয় সভাপতি মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ ছিলেন দারুল উলূম দেওবন্দ ও সাহারানপুর মাজহারুল উলূমের ছাত্র।⁶
৪. খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস ইত্যাদির শুরু হযরত মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর থেকে, যিনি মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (র.) এর খলিফা ছিলেন। মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (র.) জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের আধ্যাত্মিক গুরুদের একজন ছিলেন।⁷
৫. অন্য ধারার নেতৃত্ব : শায়খুল হাদিস আজিজুল হক একসময় জমিয়তের সভাপতি ছিলেন; ফারায়েজি আন্দোলনের নেতা পীর দুদু মিয়া দীর্ঘ সময় জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন।⁸
এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে, উপমহাদেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক আন্দোলন জমিয়তের ভাবধারার সম্প্রসারণ।
* রাজনৈতিক প্রাচীনত্ব ও ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন সংগঠন হলো জমিয়ত। প্রায় দেড়শ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় এটি কখনো “জমিয়তে আনসার”, কখনো “জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ”, আবার কখনো “জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম”, আবার কখনও নেজামে ইসলাম নামে সক্রিয় থেকেছে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে।⁹
অতএব, জমিয়ত নিছক একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী বৌদ্ধিক-রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।
* সমকালীন প্রেক্ষাপট
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে জমিয়তের বড় সংকট হলো— নেতৃত্বের একাংশ আকাবিরে দেওবন্দের উত্তরাধিকার বহন করার চেয়ে এমপি-মন্ত্রী হওয়ার রাজনীতির দিকে বেশি ঝুঁকেছেন। ফলে জমিয়তের মূল উদ্দেশ্য—ঈমান-আকিদা ভিত্তিক ইসলামী নেতৃত্ব ও সামাজিক সংস্কার— ম্লান হয়ে পড়ছে।
* উপসংহার
উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জমিয়তের অবদান অপরিসীম। এটি কেবল একটি সংগঠন নয়; বরং এক গভীর রাজনৈতিক দর্শনের ধারক ও বাহক। ইতিহাসের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রমাণ করে— জমিয়তের ভেতর থেকে উদ্ভূত বিভিন্ন দল ও আন্দোলন আসলে দেওবন্দীয় চিন্তারই সম্প্রসারিত রূপ।
অতএব, জমিয়তের পুনরুত্থান মানেই আকাবিরে দেওবন্দের রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের পুনর্জাগরণ। বর্তমান নেতৃত্ব যদি সেই ঐতিহাসিক ধারার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তবে জমিয়ত আবারও উপমহাদেশের রাজনীতিতে “দ্বীনের মাইলফলক” হিসেবে স্বীকৃত হবে।
তথ্যসূত্র
১. Metcalf, B. D. Islamic Revival in British India: Deoband, 1860–1900. Princeton University Press, 1982.
২. Rahman, Fazlur. Islam and Modernity: Transformation of an Intellectual Tradition. University of Chicago Press, 1982.
৩. Nasr, S. V. R. Mawdudi and the Making of Islamic Revivalism. Oxford University Press, 1996.
৪. Azam, Gholam. আমার দেখা রাজনীতি. ঢাকা: হাক্কানি লাইব্রেরী, ১৯৯৩.
৫. আলী, ফজলুর রহমান. সিলেটের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস. সিলেট, ১৯৮৫.
৬. Karim, Enamul. Politics of Maulana Bhashani. Dhaka: Islamic Foundation, 1983.
৭. Ahmed, Rafiuddin. The Bengal Muslims, 1871–1906: A Quest for Identity. Oxford University Press, 1981.
৮. Qasmi, Ali Raza. Jamiat Ulama-i-Hind and the Struggle for Freedom. New Delhi: Manohar, 2014.
৯. Siddiqi, Majid. The Jamiat Ulema-i-Hind: Its Political and Social Struggle. Meenakshi Prakashan, 1974.
