দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইসলাম বোঝার জন্য আবুল আ’লা মওদুদী ও তাঁর অনুসারীদের চিন্তাধারা একটি মূল সূত্র। মওদুদীবাদ মূলত রাষ্ট্র ও সমাজকে ইসলামী নীতিমালায় পুনর্গঠন করার রাজনৈতিক এজেন্ডা। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, কাশ্মির, এমনকি বাংলাদেশেও এ চিন্তাধারার বিভিন্ন প্রতিফলন দেখা যায়। বিশেষত আফগানিস্তানের যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনীতিতে মওদুদীবাদের প্রভাব অত্যন্ত গভীর।
—
মওদুদীবাদের উত্থান ও বিস্তার
আবুল আ’লা মওদুদী (১৯০৩–১৯৭৯) ভারতীয় উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামের রাজনৈতিক ও সামাজিক দিককে সামনে এনে রাষ্ট্র পরিচালনা। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এই চিন্তাধারা পাকিস্তানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং পরবর্তী দশকগুলোতে আফগানিস্তান ও কাশ্মিরেও ছড়িয়ে পড়ে।
—
আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী জিহাদ ও দুটি ধারা
রাব্বানি–মাসুদ ধারা
১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর আফগানিস্তানে বিভিন্ন মুজাহিদিন দল গড়ে ওঠে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটি ছিল জামিয়াতে ইসলামী আফগানিস্তান (বুরহানউদ্দিন রাব্বানি ও আহমদ শাহ মাসুদের নেতৃত্বে) এবং হিজবে ইসলামী (গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের নেতৃত্বে)।
রাব্বানি ও মাসুদ তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিলেন—তাজিক, উজবেক, হাজারা ও শিয়াদের অধিকার স্বীকার, নকশাবন্দি সুফিজমকে সম্মান এবং আফগান ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির প্রতি আনুগত্য।
হেকমতিয়ার ধারা
অন্যদিকে গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার পাকিস্তানি জামায়াতের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি বেশি কট্টর মওদুদীবাদী, যিনি প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামপন্থী দলগুলোকে পর্যন্ত শত্রু হিসেবে দেখতেন। হিজবে ইসলামীকে পাকিস্তানের আইএসআই ও সৌদি আরব বড় অঙ্কের অর্থায়ন করত।
—
কাবুলের পতন ও গৃহযুদ্ধ (১৯৯২–১৯৯৬)
সোভিয়েত প্রত্যাহারের পর বুরহানউদ্দিন রাব্বানি কাবুলে সরকার গঠন করেন, যেখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নেতৃত্বে ছিল। কিন্তু হেকমতিয়ার এই সরকারকে মেনে নেননি; তিনি ধারাবাহিকভাবে কাবুলে রকেট হামলা চালান। চার বছরের গৃহযুদ্ধে কাবুল প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এই সময়ই আফগান রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে পড়ে।
—
তালেবানের আবির্ভাব
গৃহযুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলার সুযোগে পাকিস্তানের মাদ্রাসা থেকে উঠে আসে তালেবান আন্দোলন। মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে তারা ১৯৯৬ সালে কাবুল দখল করে এবং হেকমতিয়ার–রাব্বানি উভয় শিবিরকেই পিছনে ঠেলে দেয়। আহমদ শাহ মাসুদের নেতৃত্বে নর্দার্ন অ্যালায়েন্স পানশীর উপত্যকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
—
২০০১ পরবর্তী সময়: নর্দার্ন অ্যালায়েন্স ও মার্কিন আগ্রাসন
৯/১১ ঘটনার পর মার্কিন আগ্রাসনে তালেবান সরকারের পতন ঘটে। মার্কিন সমর্থনে নর্দার্ন অ্যালায়েন্স ক্ষমতায় আসে। এখানে রাব্বানি–মাসুদ শিবিরের অংশ বিশেষ ক্ষমতার ভাগ পায়। আহমদ শাহ মাসুদ ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে তালেবানের আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন।
—
গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের প্রত্যাবর্তন
হেকমতিয়ার একসময় তালেবানের বিরোধী হলেও পরে নিজস্ব গেরিলা বাহিনী নিয়ে দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যান। ২০১৭ সালে তাঁর হিজবে ইসলামী কাবুল সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে। চার বছরের মধ্যে আবার কাবুল সরকার পতন হলে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসে।
—
আফগানিস্তানে মওদুদীবাদের দ্বিমুখী প্রভাব
১. ইসলামপন্থার কট্টর ও নরম ধারা: রাব্বানি–মাসুদ শিবির তুলনামূলকভাবে নরম, জাতিগত বৈচিত্র্য ও সুফি সংস্কৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করে।
২. সংঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞ: হেকমতিয়ারের কট্টর মওদুদীবাদী অবস্থান ও পাকিস্তানি নীতির কারণে আফগানিস্তান বারবার গৃহযুদ্ধে পতিত হয়।
৩. তালেবানের উত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরি: মুজাহিদিন গোষ্ঠীগুলোর ব্যর্থতার ফলেই তালেবান নিজেদের “পরিশুদ্ধ শক্তি” হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
—
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রভাব
মওদুদীবাদ কেবল আফগানিস্তানেই নয়, কাশ্মিরেও সক্রিয় ছিল। পাকিস্তানের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী কাশ্মির শাখা, একই রকম চিন্তাধারা অনুসরণ করে। সমালোচকদের মতে, এই কট্টর আদর্শ স্থানীয় মুসলিম সমাজের সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করে, যা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি করে।
—
বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন
অভ্যন্তরীণ কারণ: আফগান সমাজের জাতিগত বিভাজন, উপজাতীয় সংস্কৃতি ও নেতৃত্ব সংকট।
বহিরাগত কারণ: পাকিস্তানের আইএসআই, মার্কিন সিআইএ ও সৌদি আরবের অর্থায়ন।
মওদুদীবাদের ভূমিকা: ইসলামের নামে রাষ্ট্র গঠন ও একক আদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার কট্টর চেষ্টা আফগান সমাজের বহুত্ববাদকে ভেঙে দিয়েছে।
—
উপসংহার
আফগানিস্তানের আধুনিক ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে একপক্ষের অতিরিক্ত কট্টর ইসলামপন্থা ও অন্যপক্ষের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব—দুটো মিলে দেশটিকে বারবার ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে। মওদুদীবাদ আফগানিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজকে একটি রাজনৈতিক ইসলামি কাঠামোর মধ্যে আনতে চাইলেও বাস্তবে তা বহুত্ববাদ ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করেছে। ফলে আফগানিস্তান, কাশ্মিরসহ বহু অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়।
