— সৈয়দ মবনু
ভূমিকা
জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী উপমহাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী নাম। কিন্তু তার চিন্তা ও দর্শনের ভেতরে বহু ভ্রান্তি ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অসম্মানজনক মন্তব্য রয়েছে, যা বিভিন্ন সময়ে উলামায়ে কেরাম প্রমাণসহ তুলে ধরেছেন। যখনই এসব সমালোচনা সামনে আসে এবং জামায়াত রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, তখন তারা দাবি করে— “মওদূদী আমাদের প্রতিষ্ঠাতা বটে, কিন্তু ইমাম নন।” অথচ বাস্তবে দেখা যায়, তারা তাকে ইমামতুল্য মর্যাদা দেয়।
সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে কেউ কোনো সমালোচনা করলে জামায়াতের অনুসারীরা খুব একটা বিচলিত হন না। বরং অনেক সময় তারা বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়। কিন্তু কেউ যদি মওদূদীর সমালোচনা করেন, তখন তাদের মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায়। এ দৃশ্য স্পষ্ট করে যে, তাদের কাছে সাহাবায়ে কেরামের তুলনায় মওদূদীর মর্যাদা বাস্তবে অধিকতর।
জামায়াতের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
দেওবন্দী ও অন্যান্য আহলে হক উলামায়ে কেরাম যখন মওদূদীর ভ্রান্ত চিন্তার বিষয়ে মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক করেন, তখন জামায়াতপন্থীরা নানা কৌশল ও ভ্রান্ত প্রচারণার আশ্রয় নেন। এর কিছু উদাহরণ
১. আরবরা তাকে শায়খ ডাকে।
ব্যাখ্যা :
কিন্তু আরব সংস্কৃতিতে “শায়খ” শব্দটি খুবই সাধারণ সম্বোধন। যেমন আমরা কাউকে “হযরত” বা “জনাব” বলি, তেমনি তারা শায়খ বলে ডাকেন। আমি নিজেও ইংল্যান্ডে বহু আরব বন্ধুদের কাছ থেকে “শায়খ” সম্বোধন পেয়েছি। এতে বিশেষ কোনো মর্যাদার দাবি নেই।
২. পাকিস্তানে মওদূদীকে আরব মানের আলেম হিসেবে সম্মান করা হয়।
ব্যাখ্যা :
এটি তাদের নিজেদের ধারণা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—পাকিস্তানের বহু জ্যেষ্ঠ আলেম যেমন মাওলানা ইউসুফ বান্নুরি, মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী প্রমুখ মওদূদীর চিন্তাকে গোমরাহি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি মওদূদীর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের আলেম সমাজের একাধিক ফতোয়া-গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
৪. ইন্দোনেশিয়ায় তাকে উস্তাদ বলা হয়।
ব্যাখ্যা :
এটিও সাধারণ সাংস্কৃতিক সম্বোধন মাত্র। যেমন আমাদের সমাজে “মাওলানা” বা “হুজুর” প্রচলিত, তেমনি আরবে “শায়খ” এবং ইন্দোনেশিয়ায় “উস্তাদ”। এতে বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য নেই।
৫. সবচেয়ে বড় মিথ্যা: মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা!
জামায়াতপন্থীরা যে সবচেয়ে ভয়াবহ মিথ্যা প্রচার করে তা হলো—
“মাওলানা মওদূদী মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন।”
ব্যাখ্যা :
এই দাবি একেবারেই ভিত্তিহীন ও ইতিহাসবিরোধী। মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত ইতিহাস হলো;
প্রতিষ্ঠাকাল: মদিনা মুনাওয়ারায় অবস্থিত আল-জামিআতুল ইসলামিয়্যা ফিল মাদিনাতিল মুনাওয়ারাহ (Islamic University of Madinah) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬১ সালে (১৩৮১ হিজরি)।
প্রতিষ্ঠাতা: সৌদি বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন।
অনুমোদন: সৌদি আরবের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ধর্ম বিষয়ক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো নির্ধারিত হয়।
শিক্ষানীতির রূপকার: শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও আদর্শিক দিকনির্দেশনায় মুখ্য ভূমিকা রাখেন সৌদি আরবের প্রধান আলেম শাইখ আবদুল আজিজ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে বায (রহ.)। তার পাশাপাশি শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহিম আল-শাইখ, শাইখ আবদুল্লাহ আল-গুদাইয়ান, শাইখ আব্দুর রহমান আল-বাররাকসহ বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আরব আলেম। আমরা বিস্তারিত অনুসন্ধান করে দেখেছি—
মওদূদীর নাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, প্রশাসক বা নীতিনির্ধারক হিসেবে কোথাও নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নীতিগত দিকনির্দেশনা বা পাঠ্যক্রম প্রণয়নে তার অংশগ্রহণের প্রমাণও নেই। বিশ্ববিদ্যালয়টি সৌদি সরকারের উদ্যোগে এবং সৌদি আলেমদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অতএব, “মওদূদী মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা” — এই বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য, বিভ্রান্তিকর এবং ইতিহাস বিকৃতি ছাড়া আর কিছু নয়।
