1. abutalharayhan@gmail.com : Abu Talha Rayhan : Abu Talha Rayhan
  2. asadkanaighat@gmail.com : Asad kg : Asad kg
  3. junayedshamsi30@gmail.com : Mohammad Junayed Shamsi : Mohammad Junayed Shamsi
  4. sufianhamidi40@gmail.com : Sufian Hamidi : Sufian Hamidi
  5. izharehaque0@gmail.com : ইজহারে হক ডেস্ক: :
  6. rashidahmed25385@gmail.com : Rashid Ahmad : Rashid Ahmad
  7. sharifuddin000000@gmail.com : Sharif Uddin : Sharif Uddin
  8. Yeahyeasohid286026@gmail.com : Yeahyea Sohid : Yeahyea Sohid
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:১৯ পূর্বাহ্ন

অবিসংবাদিত এক আলেমেদ্বীন আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ.

রিপোর্টারের নাম:
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০

মাওলানা আমিনুল ইসলাম কাসেমী::
আজ এমন একজন মণিষীকে নিয়ে লিখছি, যাঁর সম্পর্কে লিখতে গেলে আমার কলমের গতি স্তদ্ধ হয়ে যায়। ফুরিয়ে যাবে মনে হয় কলমের কালি। একজন কিংবদন্তী। একজন জীবন্তগ্রন্হাগার। যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস। খ্যাতিমান সাহিত্যিক। তুখোড় বাগ্মী। আকাবির-আছলাফের বাস্তব নমুনা। দুনিয়া ত্যাগী। মহান আল্লাহর সাথে যার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তিনি আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ;। সাবেক মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ।




এমন প্রতিভাবান আলেম খুবই কম জন্মেছে এই পৃথিবীতে। চুতুর্মুখি জ্ঞান সম্পন্ন। কোনদিকে তিনি ছিলেন না? সকল দিকেই তাঁর খ্যাতি। সব বিষয়ে তাঁর মেধা কাজ করেছে। যুগ থেকে যুগান্তরে এদেশ, এ জাতিকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। মেহনত – মোজাহাদার মাধ্যমে প্রজন্মকে এক সুন্দর- সুসংগঠিত মঞ্চে দাঁড় করেছেন।
তরঙ্গায়িত সমুদ্রের নির্ভিক নাবিক ছিলেন আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ, সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে তাঁর জাহাজ চলেছে। বহু ঝড়- তুফান। বিপদসংকুল পরিবেশ। তারপরেও থেমে থাকেনি, তাঁর জাহাজ ছুটে চলেছিল মনযিলে মাকসুদে পৌছাবার জন্য। তাঁর কর্মের স্বাক্ষর গুলো আজো জ্বল জ্বল করছে।




একদম ফটোকপি ছিলেন প্রিয় উস্তাদ সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ, এর। উস্তাদের চিন্তা- চেতনার হুবহু ধারক- বাহক। জীবনের প্রতিটি ক্ষণে যেন মাদানীকে অনুসরণ করেছেন। বহু ঘাত- প্রতিঘাতের মাঝেও উস্তাদের নজরিয়া- দৃষ্টি ভঙ্গির খেলাফ কোন কাজ করেন নি। পুরোপুরি আকাবির- আছলাফের অনুসারী। দেওবন্দীয়্যাত কি ও কেন? আকাবিরের দেওবন্দের দৃষ্টি ভঙ্গি লালনকারী এক মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেব।
জীবনের পদে পদে দেওবন্দকে অনুসরণ করে চলেছেন। মেযাযে দেওবন্দ, মাসলাক – মাশরাব সব কিছুতে আকবিরদের চিন্তা- চেতনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। চলার পথে কত যে নাজুক পরিস্হিতির শিকার হতে হয়েছে তাঁকে, তবুও হার মানেন নি। এগিয়ে চলেছে দৃঢ় কদমে। পিছপা হন নি। এক মর্দে মুজাহিদ আলেমের স্বাক্ষর তিনি রেখেছিলেন।




কাজী সাহেবকে সবাই বলত আশেকে মাদানী। কুতবুল আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানীর এত আশেক ছিলেন, যা ভাবা যায় না। গুরু ভক্তি কাকে বলে? তিনি দেখিয়েছেন। যেমন মাদানী সাহেব তাঁর প্রিয় উস্তাদ শায়খুল হিন্দের জন্য ছিলেন ফেদা ( উৎসর্গিত)। ঠিক কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেব তাঁর প্রিয় উস্তাদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ; প্রতি এত ভক্তি- ভালবাসা ছিল, তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। কাজী সাহেবের প্রতিটি বয়ান – বক্তৃতায় মাদানীকে টেনে আনতেন। উস্তাদের নাম এমন বিশেষণ দিয়ে উপস্হাপন করতেন , যা অন্য কেউ পারবেনা। এমনিতে তিনি উঁচু মানের সাহিত্যিক। বাচনভঙ্গি ছিল চমৎকার। এমন ভাবে মাদানীকে তুলে ধরতেন উপস্হিত স্রোতারা বিমুগ্ধ হয়ে যেত।




কাজী সাহেবের মাদানীর প্রতি এত ভক্তি- ভালবাসা, মাদানী সাহেবের অন্য কোন শাগরেদের মাঝে পাওয়া যায় না। খোদ হুসাইন আহমাদ মাদানী সাহেবের ছোট সাহেবজাদা সাইয়্যেদ আসজাদ মাদানী তাঁর এক বক্তৃতায়, (মালিবাগ মাদ্রাসায় ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কাজী সাহেবের ইন্তেকালের পরে) কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ সম্পর্কে বলেছেন,
” কাজী সাহেব রহ, আমাদের আত্মীয় না হলেও তিনি আমাদের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আব্বাজান রহ,- কে , তিনি অসম্ভব ভালবাসতেন। আমি আমার জীবনে মানুষের জন্য মানুষের এমন ভালবাসা আর কারও মাঝে দেখিনি”। ( আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ, স্মারকগ্রন্হ- ৭৭ পৃষ্টা)




একদম সঠিক কথা। মানুষের জন্য মানুষের এত ভালবাসা দেখা যায় না। বিশেষকরে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আপন উস্তাদের প্রতি ভক্তি- ভালবাসার স্বাক্ষর রেখেগেছেন। মানুষ বড় হলে কিন্তু তার অতীতের কথা মনে থাকেনা। ছাত্র বড় হলে, বৃদ্ধ হলে হয়ত সেই ছোট বেলার উস্তাদের স্মৃতি ভুলে যায়। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন কাজী সাহেব। তিনি যতই বড় হয়েছেন, খ্যাতি লাভ করেছেন,সর্বক্ষেত্রে উস্তাদের অবদানকে তুলে ধরেছেন। উস্তাদের নসীহতগুলো, উস্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আজীবন বহন করে বেড়ায়েছেন তিনি।
কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেব একজন নির্লোভ, দুনিয়া বিমুখ আলেম ছিলেন। দুনিয়া কামানো, মাল কামানোর কোন ফিকির তাঁর মাঝে আসেনি। শত দৈন্যদশার মধ্যে তাঁর পরিবার চলেছে। উপোস থেকেছেন, অর্ধাহারে- অনাহারে দিন কেটেছে। তারপরেও দুনিয়া কামানোর ধান্দা আসেনি। দ্বীনকে বিক্রি করে দেন নি, সামান্য অর্থকড়ির লোভে।




এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ্যসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ময়মনসিংহ কাতলাসেন আলিয়া মাদ্রাসার হেড মুহাদ্দিস পদে ছিলেন বেশ কয়েকবছর। এত সুযোগ -সুবিধা হস্তগত হওয়ার পরেও সেগুলো ছেড়ে দিয়ে কওমী মাদ্রাসার সামান্য বেতনে আবার ফিরে আসেন। ইলমে হাদীসের মসনদে পুরোপুরি নিজেকে সঁপে দেন।
কোন কানাকড়ি তাঁর কাছে ছিল না। কোন সম্পদের মালিক তিনি হতে পারেন নি। যাকাত আদায় করা লাগেনি কোনদিন। ঢাকা শহরে কয়েক যুগ সময় পার করেছেন।বহু সুযোগ এসেছে কিছু করার। অনেক সরকারের উপরস্হ ব্যক্তিবর্গ তাঁকে অফার করেছে দুনিয়ার জন্য কিছু সম্পদ বানানোর। কিন্তু রাজী হন নি।
আরো আশ্চার্য হব, যশোরের ঝুম ঝুমপুরে তাঁর পৈতৃক ভিটা -বাড়ী ছিল। সেটাও মৃত্যুর অনেক আগে স্ত্রীর নামে লিখে দিয়েছিলেন। নিজের কাছে কোন কিছু রাখেন নি।




তাঁর কাছে যে টাকা আসতনা এমন নয়। কয়েকটি মাদ্রাসায় বুখারী পড়াতেন। আবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনে বিভিন্ন সময়ে অনুবাদ – সম্পাদনা বিভাগের সদস্য ছিলেন। কিন্তু কোন টাকা- পয়সা কাছে রাখেন নি। সবই মানুষের খেদমতে ব্যয় করেছেন। তাঁর বদন্যতার প্রসংসা সকলের মুখে মুখে ছিল।
একজন সুসাহিত্যিক ছিলেন কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ র, তাঁর লিখনীগুলো এত চমকপ্রদ, যা পড়লে অবাক হতে হবে। তিনি যে বইগুলো লিখিগেছেন, সেসব আমাদের মাঝে ভাস্বর হয়ে আছে। লেখার গাঁথুনী, উপস্হাপনা, ভাষার ব্যবহার, তথ্যগুলো এমন ভাবে তুলে ধরেছেন পাঠকদের হয়রান হতে হয়। তাঁর লিখিত” বৈচিত্রের মাঝে ঐক্যের সুর” মাদানী জীবন চরিতের উপর লেখা। আমার মনেহয় হাজার লিখনীর মাঝে এক লেখা। হাজার বইয়ের মাঝে এক বই। বইটার প্রতিটি পৃষ্টায় পৃষ্টায়, লাইনে লাইনে ক্ষুধার্ত পাঠকদের খোরাক রয়েছে। এ প্রজন্মের আলেমদের রয়েছে এক পথ- নির্দেশ। যদিও জীবনীগ্রন্হ। তিনি যে তথ্য- উপাত্তের ভিত্তিতে লিখেছেন, পাঠকের জ্ঞান- ভান্ডারে জমা হবে অগণিত জ্ঞানের রশ্মি। চক্ষু খুলে যাবে জ্ঞানদৃষ্টিতে অকেজো লোকদের। বাংলা – উর্দু ভাষার শ্রেষ্ঠ মাদানী জীবন চরিত গ্রন্হ বলা যায়।
কাজী সাহেবের নিজের জীবনের বাস্তব অবস্হা, মাদানীর সান্নিধ্যে তাঁর জীবন পরিক্রমার বিষয়াদী উল্লেখ করেছেন। তাঁর কলমে ওঠে এসেছে সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানীর জীবনাল্লেখ্য।




যুগ স্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস বলা হত কাজী সাহেবকে। একদম সাইয়্যেদ মাদানীকে অনুসরণ করতেন তাঁর দরসের মাঝে। তিনি যেরকম মাদানী সাহেব সম্পর্কে বলতেন, মাদানী তো বুখারীর হাফেজ ছিলেন, যেটা তিনি কোনদিন প্রকাশ করেন নি। ঠিক কাজী সাহেব তো ঐরকমই। বুখারী শরীফ পঞ্চাশ বছর ধরে পড়িয়েছেন। সবই তো ছিল তাঁর নখদর্পনে।
এ প্রসঙ্গে কাজী সাহেবের একটা ঘটনা প্রসিদ্ধ আছে। তিনি যখন ময়মনসিংহ কাতলাসেন আলিয়া মাদ্রাসার হেড মুহাদ্দিস, সে সময়ে শিক্ষাবোর্ড থেকে একটা টিম পরিদর্শনের জন্য মাদ্রাসায় এসেছিল, পরিদর্শকদের মধ্য থেকে একজন বললেন, আপনাদের হেড মুহাদ্দিস সাহেব কে? তার সাথে আমরা কথা বলব। হুজুরের পরিচয় করে দেওয়া হল, তারা প্রশ্ন করল, বলুন তো, বুখারী শরীফে ছুলাছি আছে কতগুলো।( তিন সনদে বর্ণিত হাদীস)। কাজী সাহেব সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়ে হাদীসগুলো সনদসহ বলা শুরু করলেন। উপস্হিত পরিদর্শকগণ হতভম্ব হয়ে গেলেন।




কাজী সাহেব ছিলেন ইলমের সাগর। সর্ব লাইনে তাঁর ইলম ছিল। হাদীস,ফিকাহ, তাফসীর, এমনিভাবে জেনারেল সাবজেক্টগুলোতে তাঁর প্রচুর নলেজ ছিল। যেমন বর্তমান প্রজন্মের কিছু আলেম পাওয়া যায়, একদিক আছে তো আরেকদিক নেই। অনেকে তো বাংলায় লিখতেও পারেন না। কিন্তু ব্যতিক্রম এক ব্যক্তিত্ব কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেব।
তিনি সংস্কারক। কওমী মাদ্রাসাগুলোকে আধুনিককরণ তাঁরই অবদান। কাজী সাহেব সত্তরের দশকে যখন যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা এবং মোহতামিম ছিলেন, তখন থেকেই এই সংস্কার আন্দোলন। আরবী – ফার্সী কিতাবগুলো সরাসরি বাংলা মিডিয়ামে পঠন এবং লিখন আগে ছিলনা। আরবী কিতাবদির তরজমা উর্দুতে করা হত। এরপর বাংলা। ছাত্ররা হৃদয় খুলে বুঝতে সক্ষম হত না। কাজী সাহেবই সেই যাত্রাবাড়ী থেকে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কওমী মাদ্রাসার পাঠ্যসুচীতে বাংলা ভাষার প্রচলন। আরবী ফার্সী কিতাবসমুহ সরাসরি বাংলায় পাঠ্যদান।
বহু ঝড়- তুফান সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে এই মিশন চালু করার জন্য। স্বজাতি ভায়েরা নানাবিধ ফতোয়ায় জর্জরিত করেছে। তবুও অদম্য সাহস নিয়ে দৃঢ়তার সাথে সামনে বাড়িয়েছেন।বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া আজ বাংলা ভাষায় কওমী নেসাবের কিতাবাদি পড়ানো হচ্ছে। অথচ এগুলো আগে কখনো কল্পনাও করা যায় নি।




কওমী মাদ্রাসাতে অাধুনিক আরবী ভাষা শিক্ষাদানের অবদান কাজী সাহেবেরই। বিভিন্ন জামাতে পুরানো কিছু আরবী সাহিত্যের বই ছিল, যেগুলো বাদ দিয়ে তিনি আমাদের ওলামায়ে কেরামের লিখিত আরবী কিতাবগুলো সংযোজন করেছেন। যেমন কালয়ুবী কিতাবের পরিবর্তে তিনি আবুল হাসান আলী নদভী সাহেবের “কছাছুন নাবিয়্যিন “, এবং বাকুরাতুল আদবের পরিবর্তে আবু তাহের মেসবাহ সাহেবের ” “এসো আরবী শিখি ” সংযোজন করেন। এভাবে নেছাবে কওমীয়্যার সংস্কারে তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে।
দারুল দেওবন্দ এবং দেওবন্দের আকাবিরদের প্রতি তাঁর অকুন্ঠ ভালবাসা ছিল। যে কোন সমস্যা সমাধানে তিনি দেওবন্দের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিতেন। ছাত্রদের দেওবন্দে পড়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। প্রত্যেক ফারেগীন ছাত্রকে আবার দেওবন্দে ফয়ুজ- বারাকাতের জন্য যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন সব সময়। বিশেষ করে মেধাবী কোন ছাত্র দেওবন্দে না গেলে তিনি মনক্ষুন্ন হতেন।
আকাবির- আছলাফের পদাঙ্ক অনুসারী এই মহান ব্যক্তি ছাত্রদের দেওবন্দ তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের দৃষ্টিভঙ্গি লালনকারী জামাতের সাথে জুড়ে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখতেন। পুর্বসুরীগণ যেভাবে চলেছেন, সেই বাতলানো পথে নিজে এবং নিজের শিষ্যদের চালিয়েছেন আজীবন। সদা মুরুব্বীদের পথের অনুসারী।




একজন খোদাভীরু ওলীয়ে কামেল। দুনিয়া ত্যাগী মহান মণিষী। নিজের জন্য তাঁর কিছু নেই আজো। একদম মহান প্রভুর রাহে সঁপে দিয়েছিলেন সারাজীবন।
জীবন ও কর্মঃ —
জন্ম ও বাল্যকালঃ কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেব ১৯৩৩ সনের ১৫ জুন মোতাবেক ১৩৪০ বঙ্গাব্দ ১ লা আষাঢ় বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার কালীগন্জ থানার গোপালপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। পিতার নাম, কাজী সাখাওয়াত হোসেন। মায়ের নাম নাহার।
তাঁর পিতা ছিলেন আলেম এবং ইতিহাসবিদ। বাদশাহ হারুনুর রশিদের তৃতীয় পুত্র মু’তাসিম বিল্লাহ এর নামের সাথে মিলিয়ে তাঁর নাম রাখা হয় মু’তাসিম বিল্লাহ।
আবার পারিবারিক ভাবে তাঁর মায়ের নামের সাথে মিল করে তাঁর ডাক নাম রাখা হয় বাহার। নাহারের ছেলে বাহার। সে হিসেবে তাঁর পিতা তাঁকে বাহার বলে ডাকতেন।
শিক্ষা দীক্ষাঃ ১৯৩৯ সনে সর্বপ্রথম সচেতন মায়ের হাতে প্রাথমিক শিক্ষা। এরপর গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেন।
১৯৪৩ সনে নিজ পিতার কর্মস্হল, যশোর লাউড়ী মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে অত্যান্ত কৃতিত্বের সাথে লেখাপড়া করেন।
উল্লেখ্য যে, লাউড়ী মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ছিলেন, কুতবুল আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানীর শাগরেদ ও খলিফা, আল্লামা তাজাম্মুল আলী সিলেটী (লাউড়ীর হুজুর)। কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেব তাঁর প্রখর মেধা এবং আদব আখলাকে উক্ত প্রতিষ্ঠানের সকল উস্তাদদের নজর কাড়তে সক্ষম হন। এবং অতি অল্প সময়ে সকল শিক্ষকমন্ডলীর প্রিয় পাত্র বনে যান। বিশেষ করে লাউড়ী হুজুরের খাছ ছাত্র হিসেবে স্হান দখল করেন।




১৯৫৪ সনে মার্চ মাসে ফাজিল পরীক্ষায় মাদ্রাসা বোর্ডে স্কলার মার্ক পান। এবং সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৪র্থ স্হান লাভ করেন।
কাজী সাহেবের ইচ্ছা ছিল দুনিয়াবী লাইনে অনেক লেখাপড়া করে ডিগ্রী হাসিল করবেন। কিন্তু এমন ব্যক্তির সোহবতে তিনি ধন্য, আর সামনে এগোনো হয়নি তাঁর।
শায়েখ তাজাম্মুল আলী সিলেটী ( লাুউড়ীর হুজুর) এর পরামর্শে কুতুবুল সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী এর শিষ্যত্ব লাভের আশায় ১৯৫৩ সনে দেওবন্দ গমন করেন।
এরপর দেওবন্দে ভর্তি হন। দেওবন্দে গিয়ে তিনি প্রথমে মাওকুফ আলাইহি জামাতে ভর্তি হন। সেখানে কয়েকবছর পড়াশুনা করে ১৯৫৬ সনে সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী এর কাছে বুখারী শরীফ পড়েন।
দাওরায়ে হাদীস দেওবন্দে শেষ করার পরে আরো এক বছর হযরত মাদানীর সোহবতে ছিলেন। তিনি তখন মাদানী এর কাছে বায়াত গ্রহন করেন। ঠিক ঐ বছরই মাদানী সাহেব ইন্তেকাল করেন। মাদানী সাহেবের ইন্তেকালের পরে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
কর্ম জীবনঃ দেওবন্দ থেকে ফিরে ১৯৫৮ সনে যশোর লাউড়ী মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। অত্যান্ত সুনামের সাথে তাঁর অধ্যাপনা শুরু হয়।




১৯৫৯ সনে ঢাকা বড় কাটরা মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন।
১৯৬০ সনে কিশোরগন্জ জামেয়া ইমদাদীয়াতে মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত উক্ত প্রতিষ্ঠানে অত্যান্ত সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেছেন।
১৯৬৬ সনের শেষের দিকে ময়মনসিংহ কাতলাসেন আলিয়া মাদ্রাসার হেড মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন।
১৯৬৯ সনে ঢাকা যাত্রাবাড়ী জামেয়া মাদানীয়া যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসার মুহতামিম হিসেবে যোগদান করেন। একটানা সাতবছর এখানে ছিলেন।
১৯৭৯-৮০ ঢাকা আরজাবাদ মাদ্রাসায় ছিলেন।
১৯৮০ সনে জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ এর মুহতামিম এবং শায়খুল হাদীস পদে যোগদান করেন।
মাঝখানে ৯১ থেকে ৯৩ যশোর দড়াটানা মাদ্রাসায় ছিলেন। এবং ৯৪ থেকে ৯৬ ঢাকা জামেয়া ইসলামিয়া তাঁতীবাজার ছিলেন।
আবার ১৯৯৭ থেকে ২০১৩ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মালিবাগ মাদ্রাসার মুহতামিম শায়খুল হাদীস ছিলেন।
কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ এর বর্নাঢ্য কর্মজীবন। তাঁর কর্ম জীবনে কোন স্পট নেই।অত্যান্ত সুনামের সাথে তিনি কাটিয়েছেন।
দ্বীনের একজন মর্দে মুজাহিদ সৈনিক। পুরো জীবন কেটেছে তাঁর সংগ্রাম- সাধনায়। বিরামহীন ভাবে পথ চলা। হার না মানা এক সৈনিক। যে প্রতিষ্ঠানে তিনি গিয়েছেন, সেখানেই খ্যাতি অর্জন করেছেন।




ছাত্রগড়ার কারিগর ছিলেন আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ। মেধাবীদের মেধার বিকাশ ঘটানোয় পারদর্শি এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর সান্নিধ্যে মেধাবী মুখগুলো মেলে ধরতে পারত জাতির সামনে।
সুলুক ও খেলাফতঃ
সুলুকের লাইনের এক প্রাণপুরুষ ছিলেন তিনি। দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে ফারগ হওয়ার পর প্রিয় উস্তাদ সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানীর কাছে তিনি বায়আত হন। সেখানে প্রায় একবছর যাবত রিয়াযাত- মুজাহাদায় মনোনিবেশ করেন। এরপর দেওবন্দ থেকে দেশে ফিরে প্রিয় উস্তাদ শায়েখ তাজাম্মুল আলী রহ: এর সোহবতে সময় পার করেন। এবং পরবর্তিতে খেলাফত লাভে ধন্য হন।
তাজাম্মুল আলী সিলেটী সাহেব যতদিন জীবিত ছিলেন, তাঁর সাথেই সুলুকের সম্পর্ক ছিল। এবং এ লাইনে অনেক উচ্চ আসনে পৌছে ছিলেন তিনি।




রাজনৈতিক ময়দানে কাজী সাহেবঃ
আমরা যখন দেখেছি, তখন কাজী সাহেব রাজনীতি থেকে দুরে।বিভিন্ন তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে সক্রিয় ভাবে রাজনীতিতে যান নি। তবে তিনি যখন রাজনীতি করেছিলেন,তখন তুখোড় রাজনৈতিক ছিলেন।
১৯৬৫ সনে পুর্ব পাকিস্তান জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামে সক্রিয় ভাবে জড়িত হন।
১৯৬৬ সনে পাকিস্তান জমিয়তের কেন্দ্রীয় সদস্য নির্বাচিত হন। জমিয়তের গঠনতন্ত্র তিন ব্যক্তি দ্বারা সংকলিত হয়। এক, মুফতী মাহমুদ সাহেব, দুই, মাওলানা গোলাম গাউস হাজরাবী, তিন, মাওলানা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ। কাজী সাহেব লাহোর জমিয়তের মিটিং এ প্রায় এক ঘন্টা উর্দুতে বক্তৃতা করেন।
তিনি অত্যান্ত বাগ্মী ছিলেন। তাঁর বক্তৃতায় পুরো ময়দানের স্রোতারা নীরব হয়ে যেত। বহু প্রোগ্রামে হট্রগোল সৃষ্টি হলে কাজী সাহেবের বক্তৃতায় স্তব্ধ হয়ে যেত সকলে।




কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেবের উল্লেখযোগ্য কিছু ছাত্রঃ
১/ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ, প্রখ্যাত শায়খুল হাদীস। বিশ্ববরেণ্য ইসলামী স্কলার।
২/ মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মুহতামিম, যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসা। আমীর, মজলিসে দাওয়াতুল হক বাংলাদেশ।
৩/ মুফতী ওয়াক্কাস,সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী।
৪/ মাওলানা আব্দুল জব্বার সাহেব, সাবেক মহাসচিব বেফাক।
৫/ মাওলানা আযহার আলী আনোয়ার শাহ, কিশোরগন্জ।
৬/ আব্দুর রহমান হাফেজ্জী মোমেনশাহী।
৭/ মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন। ঢাকা।
৮/ মাওলানা আবুল ফাতাহ ইয়াহইয়া রহ, সাবেক মুহাদ্দিস মালিবাগ মাদ্রাসা।
৯/ মাওলানা ইসহাক ফরিদী রহ, সাবেক মুহতামিম,চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসা।
১০/ মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ, শায়খুল হাদীস,মালিবাগ মাদ্রাসা।
১১/ ডঃ মাওলানা মুশতাক আহমাদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা।
এরকম উল্লেখযোগ্য হাজার হাজার ছাত্র রয়েছে কাজী সাহেবের। যারা বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে। সকলেই দ্বীনের দায়ী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।




বাতিলের আতঙ্ক কাজী সাহেবঃ
কাজী মু’ তাসিম বিল্লাহ সাহেব ছিলেন বাতিলের আতঙ্ক।বিশেষ করে মওদুদী এবং বেদআতীদের যম ছিলেন তিনি। কোনদিন বাতিলের সাথে আপোস করেন নি। বহু জায়গায় তর্ক- বিতর্কে তিনি বিজয়ী হয়েছেন। বিশেষ করে মওদুদী ফেরকার ব্যাপারে তাঁর শক্ত অবস্হান ছিল। তিনি এসব বাতিল ফেরকার ব্যাপারে এত জ্ঞান রাখতেন, অন্য কোন আলেমের মাঝে সেটা দেখা যেত না।
২০০৯ সনে কাজী সাহেবের সাথে আমার হজ্জের সফরের সৌভাগ্য হয়েছিল। হারাম শরীফে একজন প্রবীণ আলেমের সাথে আমার সাক্ষাত হয়। তিনি বলেছিলেন, কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ কি জিনিস আপনারা দেখেন নি, আমরা দেখেছি, যার ব্যক্তিত্বের সামনে কোন মওদুদী আর বেদআতী আসতে সাহস পেত না। মওদুদীবাদীদের পিলে চমকে যেত তাঁকে দেখলে।




মোটকথা, একজন অবিসংবাদিত আলেমেদ্বীন ছিলেন কাজী মু’ তাসিম বিল্লাহ সাহেব, বর্তমান এই সংকটকালে তাঁর কথা স্মরন হয় বারবার। ইলমী অঙ্গন যেন আজো শুণ্য হয়ে আছে। তাঁর জন্য মহান আল্লাহর কাছে দুআ করি, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে সমাসিন করুন। আমিন।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2020 Izharehaq.com
Theme Customized BY Md Maruf Zakir