1. abutalharayhan@gmail.com : Abu Talha Rayhan : Abu Talha Rayhan
  2. asadkanaighat@gmail.com : Asad kg : Asad kg
  3. junayedshamsi30@gmail.com : Mohammad Junayed Shamsi : Mohammad Junayed Shamsi
  4. sufianhamidi40@gmail.com : Sufian Hamidi : Sufian Hamidi
  5. izharehaque0@gmail.com : ইজহারে হক ডেস্ক: :
  6. rashidahmed25385@gmail.com : Rashid Ahmad : Rashid Ahmad
  7. sharifuddin000000@gmail.com : Sharif Uddin : Sharif Uddin
  8. Yeahyeasohid286026@gmail.com : Yeahyea Sohid : Yeahyea Sohid
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন

কাকলীর কইতর  || মনিরা মিতা 

রিপোর্টারের নাম:
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২০

কাকলীর কইতর  // মনিরা মিতা 

খোপের দরজাটা খোলা দেখে বুকটা ধক্ করে উঠলো কাকলীর। ভুল দেখছে নাকি বোঝার জন্য চোখ দুটো কচলে নিলসে। না, সত্যিই তো খোপ আলগা। তড়িঘড়ি খোপের ভেতর উঁকি মারে কাকলী। হাত ঢুকিয়ে খোঁজ করে। খোপ থেকে খালি হাত বের করে কান্নায় ভেঙ্গে পরে সে। ছোট কাকলীর বুকটা হাহাকার করে। এখন কি করে সে তার স্কুলের খরচ চালাবে? কি করে লাল চুড়ি আর ফিতা কিনবে?




খোপের পাশেই দুই তিনটা পশম পড়ে থাকতে দেখে সে। হ্যাঁ, এতো তার ইলি বিলি পশম। আদরের কইতর দুটোর পশম দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে কাকলী।
কাকলী যখন খুব ছোট তখন তার বাপজান শহরে গিয়েছিল। শহরে রিকশা চালাত সে। কাকলীর জন্য অনেক খেলনা নিয়ে আসতো প্রতিবার বাড়ি আসার সময়। একবার একটা পাখি কিনে এনেছিল। কাকলী পাখিটা নিয়ে সারাদিন তার খেলা করতো। পাখিটা ওর এতো প্রিয় ছিল যে কখনও হাত থেকে রাখতোই না।




মা মরা কাকলী তার নানীর কাছে থাকে। নানী তাকে অনেক আদর করেন। কিন্তু নানী তার খুব গরীব। কাকলী ছাড়া আর কেউ নেই তার। কাকলীর বাবা এবার এসে ওকে ওকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। তার বাবার অনেক স্বপ্ন। তার মেযে বড় হবে, লেখাপড়া শিখবে সমাজের সবাই ওকে মান্যি করবে।
একদিন কাকলী স্কুলে গিয়েছিল। ঘরের বারান্দায় তার শখের পাখিটা রেখে গিয়েছিল। স্কুল থেকে ফিরে দেখে তার পাখিটা নেই। কাকলীর কান্না যেন আর থামে না। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাওয়া গেল না ওটা।
কাকলী সারাক্ষণ মন খারাপ করে থাকে তার পাখিটার জন্য।
কাকলীর বাবা বাড়ি এসে মেয়ের অবস্থা দেখে ভারী কষ্ট পেল। তিনি গঞ্জের হাট থেকে কিনে আনলেন এক জোড়া ফুটফুটে কইতরের বাচ্চা।
কইতরের বাক্ বাকুম বাক্ বাকুম ডাক শুনে কি যে খুশি কাকলী!একটা কইতর ধবধবে সাদা আর একটা কুচকুচে কালো।কইতর দুটোর নাম দেয় ইলি আর বিলি। কইতর দুটো বন্ধু হয়ে যায় ওর।




নাম ধরে ডাক দিলেই নাচতে নাচতে কাছে আসে ওরা। সোহাগ করে কাকলী মাধায় বসে। কাঁধে বসে ঠোক দেয়। হাত থেকে দানা খুটে খায়। মাঝে মাঝে লুকচুরি খেলে ওরা কাকলীর সাথে। হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। কাকলী ডাকতেই থাকে ওদের। কিন্তু সাড়া দেয় না। তাপর কাকলী যখন অস্থির হয়ে যায় তখন ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে এসে হাজির হয়। কাকলী রাগ করে গাল ফুলিয়ে থাকে। ইলি-বিলি ওর পেছন পেছন ঘোরে। যতক্ষণ না কাকলী ওদের আদর করে ততক্ষন ওরা কাকলীর পিছন পিছন ঘুরতেই থাকে।
কাকলীর বাপজান অনেকদিন বাড়ি আসে না। খুব চিন্তা হয় কাকলীর। বাপজান আগে চিঠি দিত। কাকলী বানান করে সেই চিঠি পড়তো। কিন্তু অনেক দিন বাপজান চিঠিও দেয় না। বাপজান না আসার কারনে স্কুলের বেতন দিতে পারে না কাকলী।




কাকলীর ইলি বিলি ডিম পেরেছে। ওদের ডিম দেখে আনন্দে নাচতে শুরু করে সে। কাকলীর নানী বলে “বুজান তোমার কইতর দুইটার যত্ন নেও। ওরাই তোমার নেকাপড়ার খরচ জুগাইবো।”
কিছুদিন পর ইলি বিলির ফুটফুটে দুইটা বাচ্চা হয়। ইলি বিলি বাচ্চা দুইটাকে মুখে মুখ ঢুকিয়ে খাবার খাওয়ায়। বাচ্চাদের আদর করে। ইলি-বিলির বাচ্চাদের প্রতি ভালোবাসা দেখে নিজের মায়ের মুখটা মনে করতে চেষ্টা করে কাকলী। বাপজানের জন্য বুকটা উথাল পাথাত করে।




নানী বলে বাচ্চা দুটোকে বিক্রি করে দিতে। ওদের বিক্রি করলে অনেকগুলো টাকা হবে। কাকলীর স্কুলের বেতন দেওয়া যাবে। কাকলীর মনটা মুচড়ে ওঠে কিন্তু এছাড়া আর উপায়ও নেই। শেষ মেষ বাচ্চা দুটোকে বিক্রি করে দেয় নানী।
বাচ্চাদের না পেয়ে খুব কষ্ট পায় ইলি-বিলি। ওরা ঠিকঠাক খায় না। উড়ে না। সারাক্ষণ বকবাকুম বাকবাকুম করে বাচ্চাদের ডাকে। ইলি-বিলির কষ্টে কাকলীর চোখে ও পানি গড়ায়। কিন্তু কাকলী নিরুপায়।
এভাবে দিন কাটতে থাকে। কাকলীর লেখাপড়ার খরচ নিয়ে আর ভাবতে হয় না। মাঝে মাঝে কাকলী লাল চুড়ি আর ফিতাও কেনে।
কাকলীর নানী একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তার ডাকতে যায় কাকলী। কিন্তু ডাক্তার আনতে যে অনেক টাকা লাগে। তার উপর আবার ওষুধ কিনতে হবে এতো টাকা কোথায় পাবে সে!
কাকলীদের এক প্রতিবেশি ঢকা থাকে। ছুটিতে সে বাড়ি এসেছে। কাকলী দৌঁড়ে যায় তার কাছে। তার বাপজানের খরব শুনতে। কিন্তু রফিক কাকা বলে “মারে ঢাকা শহর অনেক বড়। কোথায় তর বাবা আছে আমি জানি না,” শুনে মন খারাপ করে বাড়ি ফেরে কাকলী। বাড়ি আসার পথে দেখা হয় রফিক কাকার মেয়ে বেলীর সাথে। কী সুন্দর দেখতে সে! কাকলী আর সে একই বয়সের হবে। খুব চমৎকার করে কথা বলে বেলী।
নানীর জন্য ওষুধ কিনতে হবে। ছোট কাকলী কোথায় টাকা পাবে? অথচ ওষুধ না খেলে নানী আরও অসুস্থ হয়ে যাবে। কাকলীর কাছে কোন টাকা নেই। ইলি-বিলির কোন ছানাও নেই। থাকলে হয়ত বেচে কিছু টাক হতো।
ওদিকে নানীর অবস্থা দিনদিন খারাপই হয়ে যাচ্ছে।
বিকালে কাকলী ঘরের কাজ করছিল। এমন সময় বেলী আসে কাকলীদের বাড়ি। ওকে দেখে মহাখুশি হয় কাকলী। একে একে অনেক গল্প হয় দুজনের। কাকলী ওকে ইলি-বিলির কথা বলে। বেলী ইলি-বিলিকে দেখে খুব পছন্দ করে। ওদের সাখে খেলার করে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে যায় বেলী।
পরদিন খুব ভোরে বেলীর বাবা কাকলীর বাড়ি আসে। কাকলীর নানীকে দেখতে এসেছে সে। অনেক কথার পর সে নানীর হাতে পাঁচশত টাকা গুজে দেয়। “বেলীর খুব পছন্দ হইছে কাকলীর কইতর দুটো” নানী আমার কাকলি দিকে তাকিয়ে থাকে। কাকলী দৌঁড়ে ঘরে চলে আসে। নানীর অসুখ টাকা দরকার অথচ ইলি-বিলিকে দিয়ে দিলে থাকতে পারবে না কাকলী। নানী কাকলীকে বলে ইলি-বিলিকে দিয়ে দিতে। নানী বলে এই টাকা দিয়ে ওষুধ কিনবে আর আরেক জোড়া কাইতর কিনে দেবে কাকলীকে। কাকলী বলে ইলি-বিলি শুধু কইতর না আমার বন্ধু।
ইলি-বিলিকে পেয়ে বেলী খুব খুশি। ইলি-বিলিকে যখন নিয়ে যাচ্ছিল তখন কাকলীর বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল। ইলি-বিলি যাবার পর থেকে মন খারাপ করে থাকে কাকলী। আগের মত হাসে না। স্কুলে গিয়েও কারো সাথে খেলে না। ওর কেবল ইলি-বিলি কথাই মনে পড়ে। আর মনে পড়ে বাপজানের কথা। সেই যে বাপজান ঢাকা গেল আর ফিরে এলো না। সবাই বরে ওর বাপজান আর ফিরবো না। কিন্তু কাকলী জানে তার বাপজান একদিন ঠিক ফিরে আসবে।
ইলি-বিলিকে পেয়ে খুব খুশি বেলী। সারাক্ষণ ইলি-বিলির সাথে গল্প করে। কিন্তু ইলি-বিলি কেমন যেন ঝিম ধরে থাকে। ঠিকমত খায় না। ওড়ে না।
সেদিন বিকালে উঠান থেকে কাপড় তুলছিলো কাকলী। এক সময় ঝপ করে কিছু একটা পড়লো বড় আম গাছের মাথায়। কাকলী গাছের কাছে গিয়ে ভালো করে লক্ষ্য করে।
একি! এতো ধপধবে একটা সাদা কইতর! ঠিক তার ইলির মতো। কাকলীর বুকটা ধক করে ওঠে। ও ইলি বলে ডাক দেয়। কাকলী ডাক দেওয়ার সাথে সাথে কইতরটি বাক্ বাকুম বাক্ বাকুম করে ওড়ে উড়ে কাকলীর কাঁধে বসে।




 এতো সত্যি তার ইলি। আনন্দে কেঁদে ফেলে কাকলী। ইলি কাকলীর কাঁধে বসে ঠোকর দিয়ে আদর করে ওকে। ইলি যেন বলছে  “কেন তুমি আমাকে ঢাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলে। আমার জন্য একটুও কষ্ট হয় নি তোমার। তোমাকে ছেড়ে থাকতে। পারি নাই। তাই এতোটা পথ পাড়ি দিয়ে ঠিক তোমার কাছে চলে এসেছি।”
ইলি কি করে সেই ঢাকা থেকে উড়ে ফরিদপুর চলে এতো এটা ভেবে কাকলী অবাক হলো। আর বাড়িই বা কি করে চিনলো ও। অচেনা পথ কি করে চিনে চলে আসলো ইলি ভেবে পায় না কাকলী। হয়ত এটাই ভালোবাসা। এক কইতরের ভালোবাসা তার বন্ধুর প্রতি।
এদিক ইলিকে না পেয়ে অস্থির হয়ে ওঠে বেলী। বিলিও খাওয়া ছেড়ে দিয়ে শুধু ঘু ঘু করে ডাকে। ইলি কাকলীর কাছে ফিরে এসেছে কথাটা রফিক সাহেবের কানেও পৌঁছালো। শুধু রফিক সাহেব না সবাই অবাক হয় ইলির ফিরে আসার কথা শুনে।
একদিন কাকলীকে অবাক করে দিয়ে বেলী আসে ওদের বাড়ী। সাথে আনে বিলিকে। বেলী বলে তোমার ইলি-বিলি তোমার কাছেই থাক। ওরা তোমাকে ভালোবাসে। তাই আজ থেকে ওরা শুধু তোমার।
ইলি-বিলিকে ফিরে পেয়ে আনন্দে আটখানা কাকলী। আবার আগের মত ইলি-বিলিকে নিয়ে মেতে থাকে সে।




কাকলী লেখাপড়ায় খুব ভালো। এবার ৪র্থ শ্রেণিতে উঠেছে সে। ক্লাসে প্রথম হয়েছে সে। মীমদের বাড়ি কাকলীদের বাড়ীর পাশেই।  মীম কখনও কাকলীর সাথে লেখাপাড়ায় পারে না।
কাকলীকে হারাতে না পারার দুঃখে কাঁদে মীম। মীমের বড় ভাই জীম। সে ক্লাস সেভেনে পড়ে। বোন কে কাঁদতে দেখে কাকলীর উপর খুব রেগে যায়। মীম আর জীম নানা ভাবে বিরক্ত কে কাকলীকে।
আজ সকালে ইলি-বিলিকে খোপে না পেয়ে যখন কাঁদছিলো কাকলী। ওরা তখন দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হেসেছে। কাকলীর সন্দেহ হয় ওদের উপর। নিশ্চয় ওরাই কিছু করেছে ইলি-বিলির। কাকলী দৌঁড়ে নানীর কাছে যায়। নানীকে বলে মীম আর জীমের কথা।
কিন্তু নানী বলে “আমরা গরীব মানুষ। ওরা বড়লোক। ওদের বিরুদ্ধে কিছু কইলে আর রক্ষে নাই বুবু।”
কাকলী সারাদিন বালিশে মুখ গুজে কাঁদলো। বিকালে বাড়ির পাশের ঝোপে গেল নানীর জন্য থানকুনীর পাতা তুলতে। ওখানে গিয়ে কাকলী দেখে ইলি-বিলির পশম পড়ে আছে। পাশে রক্ত। এখানেই জবাই করেছে ইলি-বিলিকে। কাকলী ইলি-বিলির পশমগুলো আকড়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। কাঁদতে কাঁদতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়। এক সময় নানী এসে ঘরে নিয়ে যায় কাকলীকে। নানী বলেন “আল্লায় এর বিচার করবেন।”




কাকলীকে আজ খুব সুন্দর লাগছে।খুব সুন্দর করে সেজেছে।আজ ওর বিয়ে।
ছোট কাকলী আজ বড় হয়েছে।ওর বাবা অনেকদিন পর গ্রামে ফিরেছে।গঞ্জে দোকান দিয়েছে।আজ ওদের আর কোন দুঃখ নেই।
সবাই কাকলীর জন্য অপেক্ষা করছে।বর আসবে এক্ষুনি। কাকলীর ঘরের দরজা বন্ধ।
সে সবার আড়ালে নিজের মায়ের সুটকেসটা খোলে।যেখানে সে খুব যত্ন করে রেখেছে তার ইলি- বিলির পশমগুলো। পশমগুলো বের করে আদর করে।দুটো পশম হাতে নিয়ে উপরে উড়িয়ে দেয়।পশমগুলো উপরে ওঠে আর নামে।কাকলীর মনে হয় তার ইলি- বিলি উড়ছে।
সুখ কিংবা দুঃখ সব সময়ই ইলি- বিলি ঘোরে কাকলীর বুকের পাঁজরে।
লেখিকা:- শিরোমনি, খুলনা।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2020 Izharehaq.com
Theme Customized BY Md Maruf Zakir