1. abutalha6256@gmail.com : abdul kadir : abdul kadir
  2. abutalha625616@gmail.com : abu talha : abu talha
  3. asadkanaighat@gmail.com : Asad Ahmed : Asad Ahmed
  4. izharehaq24@gmail.com : mzakir :
রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ০২:০১ পূর্বাহ্ন

ছাত্রজীবনের বিপর্যয়: ০১

জাফর বিপি
  • প্রকাশটাইম: বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন, ২০২১

সম্ভবত ২০১৩ সালের কথা। এক মাদ্রাসার ছাত্র আমার সেন্টারে চিকিৎসার জন্য এসেছিল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টেলিমেডিসিন’ প্রোজেক্টে কাজ করি। প্রজেক্টটি তখন ট্রায়াল পর্যায়ে ছিল। আমি সবে ইন্টারমিডিয়েট শেষে ভার্সিটি এডমিশন নেব। এই সময়ই জীবনযুদ্ধের প্রয়োজনে পড়াশোনার পাশাপাশি উক্ত প্রোজেক্টে যুক্ত হই।

তো আমরা প্রাসঙ্গিক আলাপে ব্যস্ত ছিলাম। সে হঠাৎ কথা বন্ধ করে দিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। আমি ক্ষানিকটা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার! চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়লেন যে?’

সে নিশ্চুপ। একটু পর দেখলাম, পাশদিয়ে একজন হুজুর যাচ্ছিলেন। কিন্তু আমাদের প্রতি লক্ষ করলেন না। সে আমাদের অতিক্রম করার পর ছেলেটা বসলো। এবং বললো, তিনি আমার উস্তায।

আমি তখন বিস্ময়ের একজোড়া ঢেকুর একসাথে গিলে নিলাম।

আমাদের স্কুল-কলেজের ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের কিছু বিচিত্র দৃশ্য চোখে ভেসে উঠলো।

একবার পাশের স্কুলের এক শিক্ষক সঙ্গত কারণেই এক ছাত্রকে একটু শাসন করেছিল। এর প্রতিবাদে সেই ছাত্র ও তার বন্ধুরা মিলে পানি ভরে দেয়ার নাম করে অফিস রুমের পানির জগ এনে তাতে প্রস্রাব করে রেখেছিল, এবং স্কুলের বেশ কয়েকজন স্যারকে সেই প্রস্রাব পান করিয়েছিল। স্যারদের লজ্জিত চেহারা দেখে সে কী আনন্দ ওদের! আহ্!



আরেক দিন তো, কী এক তুচ্ছ কারণে ছুটি শেষে পুরো স্কুলের সবগুলো ক্লাসের তালায় সুপার গ্লু মেরে দিয়েছিল। স্যার তাকে কেন মারলো—এই জেদে। অতঃপর পরদিন সবগুলো তালা কেটে স্যারেরা ক্লাস কন্টিনিউ করেছিল।

ইন্টারমিডিয়েট বোর্ড পরীক্ষার সময় হলে গার্ডরত স্যার একটু কড়াকড়ি আরোপ করায় কয়েকজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, আপনি রুমের বাইরে চলে যান।’

‘মানে? কেন?’

‘আমাদের লিখতে অসুবিধা হচ্ছে।’

‘হোয়াট! বেয়াদব! কতবড় সাহস!’

স্যারের একথা বলতে দেরি, আশপাশ থেকে আরও ৩-৪ জন উঠে স্যারকে একযোগে বলল, ‘এই তুই বের হ। নইলে খবর আছে।’



পুরো হল থমথমে। গার্ডে থাকা অপরজন নিশ্চুপ। স্যার লজ্জায় সত্যিই রুম থেকে বেড়িয়ে এলেন। এবং মাজিস্ট্রেট বরাবর অভিযোগ করলেন। তিনি সেদিন আশপাশেই ছিলেন। ঘটনা শুনে সোজা ক্যাম্পাসে চলে আসলেন। এবং সেই হলে ঢুকে টপাটপ দুই-তিনটাকে বহিষ্কার করলেন। এরপর নেক্সট হলে গেলেন। এভাবে পুরো কেন্দ্র থেকে সেদিন অনেকগুলো বেয়াদবকে ছাটাই করলেন।

স্কুল-কলেজে এসব দৃশ্য খুবই নরমাল। ভার্সিটিতে তো ছাত্রদের মাইর খাওয়া শিক্ষকেরও অভাব নেই। এগুলো বলে শেষ করার নয়।

তো এসবকিছু স্মৃতিচারণ করে বিস্ময়ের প্রথম ঢেকুর গিলেছিলাম—ছাত্র-শিক্ষকের পবিত্র এই সম্পর্ক এতটা নষ্ট কী করে হলো!? আর দ্বিতীয়টি গিলেছিলাম—একই এলাকায়, একই সমাজে ওরকম উৎকট অভিজ্ঞতার পাশাপাশি শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের এমন সম্মান ও ভক্তি দেখে। মনে যেন সুখের বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছিল।



নিজেকে সম্বোধন করে বলছিলাম, সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন বেয়াদব-উশৃংখলায় পূর্ণ, তখন এসকল মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কগুলো মরুর বুকে একপশলা ঝুম বৃষ্টি।



দেখতে দেখতে কেটে গেল বেশকিছু বছর। এরই মধ্যে পশ্চিমা হাওয়া পূবেও বইতে শুরু করেছে। বিরিয়ানিতে যেন পচন ধরতে চলেছে।

ছাত্র-শিক্ষকের পারস্পরিক সেই সিন্ডিকেট পর্ব, ক্লাসের ঝাল মাঠে মেটানো, কিংবা কখনো বেদম পেটানোর রেষ মাদ্রাসাগুলোতেও আছর করতে লাগলো। যদিও এখনো অতটা পঁচে যায়নি। কিন্তু দুর্গন্ধ আসা শুরু হয়ে গেছে।

সেদিন ছোটভাইয়ের মাদ্রাসার মুহতামিম সাহেব দেখা হলে খুব আফসোসের সাথে বললেন, ‘আপনার ছোটভাই তো এবার পরীক্ষা দিচ্ছে না।’

‘পরীক্ষা দিচ্ছে না মানে?’

‘হ্যাঁ, শুধু ও একা না। ওর ক্লাসের কেউ দিচ্ছে না। কয়েকজন তো নেতা হয়ে গেছে। ওদের নেতৃত্বে আপনার ভাইও চলছে। আমাদের কোনো কথা ওরা কেউ শুনে না।’

একথা শুনে আমার মাথায় যেন খুন চড়ে বসলো।

‘কী বলছেন এসব! আমার ছোটভাই এসব করেছে! আচ্ছা আমি আজই দেখছি বিষয়টা।’

”ওকে বকাঝকা দিয়েন না। একটু বুঝিয়ে বলুন। ওদের সাথে দল পাকিয়ে এভাবে জীবনটা নষ্ট করে ফেলবে। আমাদের অলরেডি সিদ্ধান্ত হয়েছে, এবার যারা পরীক্ষা দেবে না, ওদের সবাইকে বহিষ্কার করব। তবে এর আগে সবার গার্ডিয়ানকে জানাচ্ছি। তাই আপনাকে বলা।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে, ব্যাপারটি দেখছি আমি।’

এই বলে প্রস্থান করে ছোটভাইকে তলব করলাম। পড়াশোনার খোঁজখবর নেয়ার একপর্যায়ে পরীক্ষার প্রসঙ্গ টানলাম। কোনোপ্রকার কপট মেজাজ না দেখিয়ে ওর কথাগুলো শুনলাম এবং কেন ওরা সবাই মিলে পরীক্ষা বর্জন করলো তা শুনলাম। এমনও তো হতে পারে, অথরিটির স্বেচ্ছাচারিতায় ওরা বিরক্ত। তাই আগে ওদের কথাও শুনা দরকার। একে একে বলল কথাগুলো।



ওদের মূল সমস্যা হলো, ওরা শবে বরাতের আগেই পরীক্ষা শেষ করতে বলেছে। শবে বরাতের পর ছুটিতে যাবে এজন্য। কিন্তু মাদ্রাসার পক্ষ থেকে রুটিন দেয়া হয়েছে শবে বরাতের পর পরীক্ষা হবে। সবাই মিলে আপত্তি জানালে শিক্ষকদের ও মাদ্রাসার সার্বিক অবস্থা এবং দেশের সার্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে দ্রুতই পরীক্ষাটা নেয়া যাচ্ছে না। তাই অথরিটির সুবিধামত তারা রুটিন দিয়েছে। অন্যান্য সব জামাত মেনে নিলেও ওদের জামাতের কয়েকটা ‘হবু দ্বীনি পাতি নেতা’ তা মানতে পারলো না। এবং ক্লাসের সবগুলোকে ভুলিয়েভালিয়ে দল পাকালো। এবং সম্মিলিতভাবে পরীক্ষা বয়কট করলো।

এসব শুনে মনে চাচ্ছিল সবকটাকে ডেকে টাস টাস করে গালগুলো লাল বানিয়ে দিই। এরপর কথা। কিন্তু সেই অধিকার তো আমার নেই। তাই আমার ছোটটাকে দিয়েই যা করার করতে হবে। ওরা যেভাবে করতে যাচ্ছে, আর মুহতামিম সাহেব যে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, এমনটা হলে এই জামাতের সবকয়টার জীবনে রেডমার্ক পড়ে যাবে। এলাকায় বেশ বড়সড় একটা সোরগোল পড়ে যাবে। কী একটা বিচ্ছিরি অবস্থা।

ওকে ডেকে বললাম, ‘ভাইয়া, তোমরা এখন তালিবুল ইলম। আর তোমাদের উস্তাযগন তোমাদের পিতা সমতুল্য। তোমরা তোমাদের ব্যক্তিগত সুবিধার কথা চিন্তা করে পরীক্ষা আগে নেয়ার কথা বলছো। কিন্তু উস্তাযদের মাথায় শুধু তোমাদের জামাত না। পুরো মাদ্রাসা তাদের মাথায়। তাই যেকোনো একটা দিক দেখে হুটহাট কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব না। তার উপর দেশের যে অস্থির পরিস্থিতি, এতে শিক্ষকসংকট, আর্থিক সংকট সহ নানাবিধ চাপ তাদের মাথার উপর। সবকিছু অবলিলায় হজম করে তারা কোনোরকম নূন্যতম কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় তোমাদের এই খামখেয়ালিপনা কি না করলেই হতো না? উস্তাযদের এভাবে মানসিক চাপে ফেলে সার্টিফিকেট অর্জন করে কী করবে জীবনে? তাদের মনে যে ব্যথা তোমরা দিচ্ছো, এই ব্যথা ভেদ করে ইলম তোমাদের পর্যন্ত পৌঁছবে না। গ্রন্থগত জ্ঞান হয়তো কিতাব পড়ে আত্মস্থ করতে পারো, কিন্তু উপকারী ইলম থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। মনে রেখো, এই উম্মাহর একজন আলিমের মর্যাদা যেমন বনি ইসরাইলের নবীদের মর্যাদা তুল্য, তেমনি জাহান্নামে সর্বপ্রথম নিক্ষিপ্ত হবে এই আলিমরাই। এদের মধ্য থেকে যারা ওলামায়ে ‘ছু’ হবে তারা। কত আলিম এমন আছে, যাদের ইলমই তাদের ধ্বংসের কারণ। এমন ইলম থেকে রবের পানাহ। এজন্য রাসূল সা. উপকারী ইলমের জন্য দোয়া করতে শিখিয়েছেন।

শিক্ষাজীবনের শুরুতে হেয়ালিপনার ধোকায় পড়ে, এবং দু’একটা বেয়াদবের সাথে তাল মিলিয়ে তুমিও কেন এমন করছো? এই বছর একসাথে আছো, পরের বছর একসাথে নাও থাকতে পারো। ওরা অন্যকোথাও চলে যেতে পারে। এরপর তো একাই চলতে হবে। কিন্তু মধ্য থেকে তুমি ওদের কারণে তোমার উস্তাযদের সাথে বেয়াদবি করে নিজের ওপর অভিশাপ নিয়ে আসলে। এই অভিশাপের বোঝা থেকে আজীবনও কি আর মুক্ত হতে পারবে? তোমাকে তো আমি এতটা বোকা মনে করতাম না। তুমি এখন যথেষ্ট বড় হয়েছো। তোমার ভালোমন্দ ও পড়াশোনা সম্পর্কে তুমিই ভালো বোঝো।

একটা কথা মনে রাখবে, ইলম শুধু কিতাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইলমের বুঝ ও গভীরতা রবের পক্ষ থেকে আসে। তিনি যার ব্যাপারে কল্যাণের ইচ্ছা রাখেন, তাকে সেটা দান করেন। কিন্তু বেয়াদবরা এই নিয়ামত থেকে বঞ্চিত থাকে। ইলমে লাদুনি ও নম্রতা, আদব এগুলো একে অপরের পরিপূরক। এক্ষেত্রে উস্তাযের দোয়া বিদ্যুতের মতো তড়িৎ কাজ করে। অনেক ব্যাকবেঞ্চার ছাত্রকে বড় আল্লাহওয়ালা আলিম হতে দেখেছি। আবার অনেক ফার্স্টবয়কেও শার্ট-প্যান্ট পরে নারী নিয়ে তামাশা করতে দেখেছি।

এগুলো উস্তাযের দোয়া ও রবের এহসানের কারামত। শুধু ভালো রেজাল্ট ভালো আলিম ও ভালো মানুষ হওয়ার মাপকাঠি নয়।’

কথাগুলো ও একমনে শুনছিল। এরপর সুবোধের মতো বলল, ‘এখন কী করব তাহলে?’

এরপর বললাম, ‘কালই তুমি হুজুরের কাছে গিয়ে মাফ চাইবে। আর বলবে, হুজুর, ওরা যা ইচ্ছে করুক, আমি আপনাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব করব। পরীক্ষাও দেব। কেউ না দিলে আমি একাই দেব। আর ওদের সাফ জানিয়ে দেবে, আমি তোদের সাথে নাই। আমি পরীক্ষা না দিলে আমার ভাইয়া বাসায় জায়গা দেবে না আমাকে। এভাবে আমার ওপর ছাড়বে। এতে তোমাকে আর চাপ দিতে পারবে না। এই এককথা বলে তুমি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দেবে। এটাই আমার শেষ কথা।

এতে অন্যরাও তোমার দেখাদেখি পরীক্ষা দেবে। নেতা যেগুলা আছে ওরা বাদ যায় যাক, তোমরা যারা নেতামি না করে পড়াশোনা করো, তোমরা অন্তত সবাই পরীক্ষাটা দাও। আর কখনো উস্তাযদের সিদ্ধান্তের বাইরে এমন জেদ ধরবা না। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবা। আমি কথা বলে দেখব কী হয়েছে না হয়েছে। নিজেরা এভাবে দল পাকাবা না। আর পারলে ওদেরকেও বিষয়টা বুঝিয়ে বলবা। ঠিক আছে?’

এরপর কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে দিলো। আমিও হেসে দিয়ে বললাম, ‘উস্তাযের কাছে মাফ চাওয়ায় ছাত্রের জন্য লজ্জার কিছু নেই। বোকা ছেলে। যাও, মাদ্রাসায় যাও। আর শোনো, কিছু লাগবে এখন?’

‘নাহ, আছে।’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে। লাগলে সরাসরি ভাইয়াকে জানাবা। ওকে?’

‘আচ্ছা ভাইয়া, যাই, আসসালামু আলাইকুম।’

‘ওয়া আলাইকুমুসসালাম।’

পরদিন খোঁজ নিয়ে দেখি, হ্যাঁ, ওকে যেভাবে বলেছি, সেভাবে করেছে। সবাই না গেলেও ও নিজে মুহতামিম সাহেবের কাছে গিয়ে অনুতপ্ত হয়ে পরীক্ষা দিয়েছে।

বিষয়টি বলার উদ্দেশ্য হলো, জেনারেল ছাত্রদের মতো আজকাল মাদ্রাসা ছাত্রদের মাঝেও বিদ্রোহী মনোভাব জেগে উঠেছে। এজন্য অবশ্য অনেক ক্ষেত্রে কিছু উস্তাযের সৈরাচারী মনোভাবও একটা ফ্যাক্ট। কিন্তু তবুও যে হারে এমন উশৃংখলতা বাড়ছে, তা চরম উদ্বেগের বিষয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
copyright 2020:
Theme Customized BY MD MARUF ZAKIR