1. info@izharehaq.com : MZakir :
রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ০৩:৫২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
আহলে সুন্নতের ফিক্বাহ শাস্ত্রের ইমাম: ইসলামী আমলের ক্ষেত্রে বিদয়াতীদের চক্রান্ত আহলে সুন্নতের আক্বীদামতে মহানবীর মর্যাদা: অতি ভক্তি কিসের লক্ষণ রেজভীদের চক্রান্ত হুবহু ইবনে সাবার চক্রান্তের মত: রাসূলকে আলিমুল গাইব বলা সাবায়ী চক্রান্ত: আহলে সুন্নত ওয়াল জমা’ত সুবিন্যস্ত হওয়ার ইতিহাস কুরআন ও হাদীসের ভাষায় ছিরাতে মুস্তাক্বীম বা সোজা পথ: নবুওয়াত ও রিসালত: মওদুদীবাদ ইবাদত: মওদুদীবাদ কুরআন মাজীদ ও দ্বীনের সংরক্ষণ: কুরআন সংরক্ষণের অর্থ: কুরআন সংরক্ষণে খোদায়ী ব্যবস্থাপনা: মওদুদীবাদ দ্বীন কী? দ্বীনে নূহ: দ্বীনে ইব্রাহীম: দ্বীনে ইসমাঈল: দ্বীনে ইউসুফ: দ্বীনে মূসা: দ্বীনে ঈসা: মওদূদীবাদ মওদুদী সাহেবের শিক্ষা-দীক্ষার পরিধি গোয়েবলসীয় নীতি : হিটলারের ঐ মুখপাত্রও ”জামাত-শিবিরের মিথ্যাচারের কাছে হার মানায়”: পর্ব ১ ইক্বামাতে দ্বীনের তাৎপর্য এবং বাতিলপন্থীদের বিকৃত ব্যাখ্যা সাহাবাগণ রাঃ সত্যের মাপকাঠি এবং তাদের ইজমা সর্বসিদ্ধান্ত মতে শরীয়তের দলীল সাহাবা রাঃ গণ সত্যের মাপকাঠি খোলাফায়ে রাশেদীনগণের সোনালী আদর্শ সর্বসম্মতিক্রমে শরিয়তের দলীল শায়খ আলিমুদ্দীন দুর্লভপুরী”র ঐতিহাসিক ও তাত্বিক বক্তব্য: “তাঁরাই সত্যের মাপকাঠি” শায়খ আলিমুদ্দীন দুর্লভপুরী”র ঐতিহাসিক ও তাত্বিক বক্তব্য: সাহাবায়ে কেরাম “সত্যের মাপকাঠি: মিয়ারে হক: সত্যের মাপকাঠি: কুরআন-হাদীস এবং মওদূদী সাহিত্যের আলোকে: পর্ব-৬ মিয়ারে হক: সত্যের মাপকাঠি: কুরআন-হাদীস এবং মওদূদী সাহিত্যের আলোকে: পর্ব-৫ মিয়ারে হক: সত্যের মাপকাঠি: কুরআন-হাদীস এবং মওদূদী সাহিত্যের আলোকে: পর্ব-৪

ইবাদত: মওদুদীবাদ

মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারূক
  • আপডেট সময় : শনিবার, ২৫ মে, ২০২৪
  • ৫৪ বার পড়া হয়েছে

ইবাদত

(কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে)



কুরআনে কারীমের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহ তা’য়ালা মানব ও জ্বীন জাতিকে এ পৃথিবীতে একমাত্র তাঁর ইবাদতের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। ঈমানের পরেই ইবাদতের স্থান। ইরশাদ হয়েছে:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
ইবাদতের অর্থ কি? ইবাদত মূলতঃ কাকে বলে? আরবী অভিধানসমূহে ইবাদতের শাব্দিক অর্থ গোলামী করা বা দাসত্ব করা। ইসলামী পরিভাষায় ইবাদত বলা হয়, মহান রাব্বুল আলামীনের সমীপে নির্দিষ্ট পন্থায় নিজেকে চরম ও পরমভাবে হেয় ও বিনয়ী প্রকাশ করাকে। অর্থাৎ মহাপরাক্রমশালী ও প্রতাপশালী স্রষ্টার মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের সামনে আত্মসমর্পণ করে নিজের অতিশয় দীনতা, হীনতা, ক্ষুদ্রতা ও কাতরতাকে কুরআন হাদীসে বর্ণিত পন্থায় প্রকাশ করাকে ইবাদত বলা হয়।
কুরআনে কারীম এবং হাদীস গ্রন্থে ইবাদতের পাশাপাশি আরেকটি শব্দও বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে। তাহলো ‘এতায়াত’ (আনুগত্য)। ইবাদত ও এতায়াত শব্দ দু’টি শুনতে প্রায় একই রকম মনে হলেও শব্দ দু’টির ভাব, ব্যাখ্যা এবং ব্যবহারে বিরাট ব্যবধান রয়েছে। কেননা ইবাদত অর্থ হল, একমাত্র আল্লাহর জন্য বান্দার চরম পর্যায়ের হেয়তা প্রকাশ আর এতায়াত হলো আল্লাহ বা অন্য কারো আনুগত্য করা। কেউ কারো অনুসরণ করলে বা অনুগত হলে তাকে এতায়াত বলে আখ্যায়িত করা হয়। এই আনুগত্য অনুসরণ আল্লাহর হতে পারে, আল্লাহর রাসূলের হতে পারে, হতে পারে-পিতা-মাতার বা উস্তাদের কিংবা যে কোন বড় ব্যক্তির।
শিক্ষাঙ্গণের সব সদস্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিধান ও তার আইন মেনে চলে। পুলিশ, বিডিআর, আর্মি, ড্রাইভার, পাইলট, মিল-ফ্যাক্টরীর কর্মচারী, কর্মকর্তা, যে কোন সংগঠন ও সমিতির সদস্যবৃন্দ, ডাক্তার, আইনজীবী সবাই নিজ নিজ বিভাগের ও প্রতিষ্ঠানের বিধান ও আইন মেনে চলে।
প্রত্যেক অধীনস্থ ব্যক্তি তার উপরস্থের অনুগত থাকে, এটাই মানব সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম। মানবজীবনের শান্তি-শৃংখলা এতেই নিহিত। কিন্তু ঐ সব বিধান মেনে চলা বা ঐ সব আনুগত্যের নাম ইবাদত বা উপাসনা নয়। ইবাদত তো শুধু আল্লাহর জন্যই। কালিমা তাইয়্যেবার অর্থও এই যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। (কালিমার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন অনুসরণযোগ্য বা বিধানদাতা নেই। কারণ অনুসরণযোগ্য বা বিধানদাতা অনেকেই হতে পারে।) তাই ইবাদত ও এতায়াত সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। একটিকে অপরটির সাথে মিলিয়ে ফেললে তাওহীদের মূল কাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে।
ঐ নির্দিষ্ট পন্থা ও আচার অনুষ্ঠান কি? যা দ্বারা তাওহীদ ও শিরকের পার্থক্য করা হয়? এবং যার দ্বারা বান্দাহ তাওহীদের স্বীকৃতি প্রদান করে? তাহলো নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ, যিকর, তিলাওয়াত ইত্যাদি। এই কাজ গুলোকে ইবাদত বলা হয়।
হযরত নূহ (আ.) থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত প্রত্যেক নবী স্ব স্ব উম্মতকে ঈমানের সাথে সাথে এক আল্লাহর ইবাদতের আদেশ করেছেন। অবশ্য প্রত্যেক নবী-রাসূলের ইবাদতের রূপ এক ও অভিন্ন ছিল না। এক্ষেত্রে ভিন্নতা ছিল।
আল্লাহ তা’য়ালা হযরত ইব্রাহীম, ভূত, ইসমাঈল, ইসহাক ও ইয়াকুব (আ.)-এর আলোচনা করে ইরশাদ করেনঃ
وَجَعَلْنَا هُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَ اِقَامِ الصَّلُوةِ وَإِيتَاءِ الزَّكُوةِ وَكَانُوا لَنَا عَابِدِينَ .
“আর আমি তাদেরকে করেছিলাম ইমাম, তাঁরা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথ প্রদর্শন করত। তাঁদের কাছে ওহী প্রেরণ করেছিলাম সৎকর্ম করতে, সালাত কায়েম করতে এবং যাকাত প্রদান করতে; আর তাঁরা আমারই ইবাদত করত।” (সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৭৩)
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছেঃ
وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَآمَنَّا وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلَّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ.
“এবং সেই সময়কে স্মরণ কর, যখন কাবাগৃহকে মানব জাতির মিলন কেন্দ্র এবং নিরাপত্তার স্থল করেছিলাম এবং বলেছিলাম তোমরা মাক্কামে ইব্রাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর। আর আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী, রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য আমার গৃহকে পবিত্র রাখতে আদেশ দিয়েছিলাম। (সূরা বাকারা, আয়াতঃ১২৫)
ঈসা (আ.) মায়ের কোল থেকেই নিজের দ্বীনের ঘোষণা দিয়ে বলেনঃ
إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَمَا كُنْتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلوةِ وَالزَّكُوةِ مَا دُمْتُ حَيًّا –
“আমি তো আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন আর আমাকে নবী করেছেন এবং যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। আর তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে। (সুরা মারয়াম, আয়াতঃ ৩০-৩১)
শত শত আয়াত ও হাজার হাজার হাদীসে নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকর ও তেলাওয়াতের আদেশ বিদ্যমান। ঈমানের পরে এই ইবাদত গুলোই হলো দ্বীনের মূল ভিত্তি। এই ইবাদত বিকল্পহীন-অপরিহার্য। তাই কেউ যদি এইসব ইবাদতকে তুচ্ছ বা দ্বীনের গৌণ বিষয় মনে করে অথবা নামায বা নামাযীকে নিয়ে ঠাট্টা করে, তাহলে সে ইসলামের বিরোধিতায় কাফিরদের কাতারে শামিল হয়ে যাবে।



মওদুদীবাদ



উপরে কুরআন ও হাদীসের দলীলের ভিত্তিতে বর্ণিত ইবাদতের সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ভঙ্গিতে মওদুদী সাহেব ইবাদতের ব্যাখ্যা করেছেন এভাবেঃ
ক) দ্বীন মূলতঃ রাষ্ট্র সরকারকেই বলা হয়। শরীয়ত হচ্ছে এর আইন এবং এ আইন ও নিয়ম প্রথা যথারীতি মেনে চলাকে বলা হয় ইবাদত। (খুতবাত, পৃঃ ৩২০, ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষাঃ ২৫৮)
খ) পূর্বে যেমন একাধিকবার বলেছি এখনও বলছি, বর্তমান মুসলমানগণ নামায, রোযার আরকান (আভ্যন্তরীণ জরুরী কাজ) এবং তার বাহ্যিক অনুষ্ঠানকেই আসল ইবাদত বলে মনে করছে। অথচ এটা অপেক্ষা বড় ভুল আর কিছুই হতে পারে না। (ইসলামী বুনিয়াদী শিক্ষা, পৃ.১৪৯, খুতবাত পৃ.১৯২)
গ) আপনি হয়ত মনে করেন, হাত বেঁধে কেবলামুখী হয়ে দাঁড়ানো, হাটুর উপর হাত রেখে মাথা নত করা, মাটিতে মাথা রেখে সিজদা করা এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট শব্দ উচ্চারণ করা শুধু এ কয়টি কাজই ইবাদত। হয়তো আপনি মনে করেন, রমযানের প্রথম দিন থেকে শাওয়ালের চাঁদ উঠা পর্যন্ত প্রত্যেক দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার বন্ধ করার নামই ইবাদত। আপনি বুঝে থাকেন, মক্কা শরীফে গিয়ে কাবা ঘরের চারদিকে তাওয়াফ করার নামই ইবাদত। মোটকথা, এ ধরনের বাহ্যিক রূপকে আপনারা ইবাদত মনে করে নিয়েছেন এবং এ ধরনের বাহ্যিক রূপ বজায় রেখে উপরোক্ত কাজগুলো কেউ সমাধা করলেই আপনারা মনে করেন যে, সে ইবাদত সুসম্পন্ন করেছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহ তা’য়ালা যে ইবাদতের জন্য আপনাকে সৃষ্টি করেছেন এবং যে ‘ইবাদত’ করার আদেশ আপনাকে দেয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। সে ইবাদতের নির্দিষ্ট কোন সময় নেই। সে ইবাদত সব সময় হওয়া চাই। সে ইবাদতের কোন নির্দিষ্ট প্রকাশ্য রূপ নেই, সময় নেই। প্রতিটি রূপের প্রত্যেক কাজেই আল্লাহর ইবাদত হতে হবে। (ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা, পৃঃ ১০৫-৬; খুতবাত, পৃঃ ১৩৬-১৩৭)
ঘ) বস্তুত ইসলামে নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদতসমূহ এ উদ্দেশ্য প্রস্তুতির জন্যই নির্দিষ্ট হয়েছে। দুনিয়ার সমস্ত রাষ্ট্র শক্তি নিজ নিজ সৈন্য বাহিনী, পুলিশ ও সিভিল সার্ভিসে কর্মচারীদের সর্বপ্রথম এক বিশেষ ধরনের ট্রেনিং দিয়ে থাকে, সেই ট্রেনিং,-এ উপযুক্ত প্রমাণিত হলে পরে তাকে নির্দিষ্ট কাজে নিযুক্ত করা হয়, ইসলামও তার কর্মচারীদের সর্বপ্রথম এক বিশেষ পদ্ধতির ট্রেনিং দিতে চায়, তারপরই তাদের জিহাদ ও ইসলামী হুকুমত কায়েম করার দায়িত্ব দেয়া হয়।” (ইসলামের বুনিয়াদ শিক্ষা, পৃঃ ২৫৪; খুতবাত, পৃঃ ৩১৫)
ঙ) নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত সম্পর্কে ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সেই আলোচনা প্রসঙ্গে আমি বলেছি যে, এসব ইবাদত অন্যান্য ধর্মের ইবাদতের ন্যায় নিছক পূজা-উপাসনা অনুষ্ঠান মাত্র নয়।
কাজেই এরূপ একটি কাজ করে ক্ষান্ত হলেই আল্লাহ তা’য়ালা কারো প্রতি খুশী হতে পারেন না। মূলতঃ একটি বিরাট উদ্দেশ্যে মুসলমানদেরকে প্রস্তুত করার জন্য এবং একটি বিরাট দায়িত্বপূর্ণ কাজে তাদেরকে সুদক্ষ করার উদ্দেশ্যেই এসব ইবাদত মুসলমানদের প্রতি ফরয করা হয়েছে। মানুষের উপর থেকে গায়রুল্লাহর (আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য শক্তির) প্রভৃত্ব বিদূরিত করে শুধু আল্লাহর হুকুমতপ্রভূত্ব কায়েম করাই এসব ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য এবং এ উদ্দেশ্য লাভের জন্য মন প্রাণ উৎসর্গ করে সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করার নামই হচ্ছে জিহাদ। নামায, রোযা ও যাকাত প্রভৃতি ইবাদতের কাজগুলো মুসলমানদেরকে এ কাজের জন্যে সর্বোতভাবে প্রস্তুত করে। কিন্তু মুসলমানগণ যুগ যুগ ধরে এ মহান উদ্দেশ্য ও এ আসল কাজকে ভুলে আছে। সে কারণেই তাদের সকল ইবাদত-বন্দেগী নিছক অর্থহীন অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। (ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা, পৃ.২৪৭; খুতবাত, পৃ.৩০৭)
চ) নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত যে কোন্ বৃহত্তর উদ্দেশ্যের জন্য ফরয করা হয়েছে, পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে আশা করি পাঠকগণ তা সুষ্পষ্টরূপে বুঝতে পেরেছেন। যদিও আজ পর্যন্ত এগুলোকে নিছক পূজা অনুষ্ঠানের ন্যায়ই মনে করা হয়েছে। দীর্ঘকাল পর্যন্ত এই ভ্রান্ত ধারণাই বদ্ধমূল করে রাখা হয়েছে। এটা যে একটি বিরাট ও উচ্চতর কাজের
প্রস্তুতির উদ্দেশ্যেই বিধিবদ্ধ হয়েছে, তা আজ পর্যন্ত প্রচার করা হয়নি। এ কারণেই মুসলমানগণ নিতান্ত উদ্দেশ্যহীনভাবেই এ অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে আসছে। কিন্তু মূল কাজের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কোন ধারণাই তাদের মনের মধ্যে জাগ্রত হয়নি। যদিও মূলত: সে জন্যই এ ইবাদত সমূহ ফরজ করা হয়েছে। (খুতবাত ৩১৮, ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা, পৃঃ ২৫৭)
ছ) দুনিয়ার কাজ-কর্ম পরিত্যাগ করে এক কোনায় বসে যাওয়া এবং ‘আল্লাহ আল্লাহ করার’ নাম ইবাদত নয়। বরং এ দুনিয়ায় আপনি যে কাজই করেন না কেন তা ঠিক আল্লাহর আইন ও বিধান অনুসারে করার অর্থই হচ্ছে ইবাদত। (ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা, পূঃ ১০৮, খুতবাত, পৃঃ ১৩৯)
দুনিয়ার বিপুল কর্ম জীবন পরিত্যাগ করে ঘর বা মসজিদের কোনে বসে তাসবীহ পড়াকে ইবাদত বলা যায় না। বস্তুত দুনিয়ার এ গোলক ধাঁধায় জড়িত হয়ে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করার নামই ইবাদত। (ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা, পৃঃ ১০৯, খুতবাত, পৃঃ ১৪০)
জ) আমি এ কথা বলতে চাই যে, জিহাদের বাসনা না হলে এবং জিহাদকে উদ্দেশ্য হিসাবে গ্রহণ না করলে ইবাদত একেবারেই অর্থহীন, এ ধরনের অর্থহীন অনুষ্ঠান পালন করে যদি আল্লাহর নৈকট্য লাভ সম্ভব মনে করা হয়, তবে বিচারের দিন এর সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হবে। (ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা, পৃষ্ঠাঃ ২৫৭)/
ঝ) আমি যদি আপনাদের এরূপ হতে সায় দিতে পারতাম তাহলে কোন কথা ছিল না। কিন্তু আমিতো তা পারছি না। যে সত্য আমি জানতে পেরেছি, তার বিরুদ্ধে কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি বর্তমান অবস্থায় পাঁচ ওয়াক্তের নামাযের সাথে তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত প্রভৃতি নামাযও যদি পড়া হয়, পাঁচ ঘন্টা করে দৈনিক কুরআন শরীফ তেলায়াত করা হয়, রমযান শরীফ ছাড়াও বছরের অবশিষ্ট এগারো মাসের সাড়ে পাঁচ মাসও যদি রোযা রাখা হয়, তবুও কোন ফল হবে না। (ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা, পৃঃ ১৪১; খুতবাত, পৃঃ ১৭৯)

সার সংক্ষেপ

১। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিক্র ও তেলাওয়াত ইবাদত নয়।
২। ইসলামী সরকার গঠনের জন্য নামায, রোযা ইত্যাদিকে ট্রেনিং কোর্স হিসেবে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।
৩। ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া ঈমান, ইসলাম নিরর্থক।
৪। জিহাদের বাসনা ছাড়া নামায, রোযা, যিকর ও তেলাওয়াত ইত্যাদি কবুল হবে না।
৫। দুনিয়ার কাজ-কর্ম ছেড়ে মসজিদে বসে যিকির করা ইবাদত নয়।
৬। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকির ও তেলাওয়াতকে মুসলমানরা ইবাদত বলে। ইহা এক ভুল ধারনা।
৭। আসল ইবাদত যার জন্য আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। সে ইবাদতের কোন নির্ধারিত সময় নেই ও তার কোন নির্দিষ্ট আকার নেই।


পর্যালোচনা



এখান থেকে আমরা মওদুদী সহেবের ইবাদত বিষয়ক মন্তব্যের পর্যালোচনা শুরু করছি। এ পর্যালোচনা দ্বারা মওদুদী সাহেবের ইবাদত বিষয়ক মনগড়া ব্যাখ্যার মুখোশ উন্মোচিত হবে। বলা বাহুল্য, মওদুদী সাহেব ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করাকেই আসল ইবাদত বলতে চেয়েছেন।
১। মূলতঃ মওদুদী সাহেবের সংকলন ও রচনাবলী গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে তার এরূপ বাতিকগ্রস্ততা পরিলক্ষিত হয় যে, তিনি আপন লিখনীতে ইসলামের মূল স্তম্ভের অপরিহার্যতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে এগুলোকে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় আমলের পর্যায়ে দাঁড় করিয়েছেন। সেই সাথে সাথে ঐ অপরিহার্য ফরয আদায় করাই যে ইবাদতের মূল তাও তিনি নাকচ করে দিয়েছেন ধৃষ্ঠতার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। যাতে করে সর্ব সাধারণের হৃদয় মানস থেকে উক্ত ফরয আদায় করার গুরুত্ব এবং ফরয হিসাবে বিশ্বাস করার ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। এক্ষেত্রে তিনি সুকৌশলে একটি আলোচ্য বিষয়ের শিরোনামের আওতায় ঐসব গুরুত্বপূর্ণ ফরযকে যেনতেন
ভাবে ঢুকিয়ে দিয়ে ফরজগুলোর মর্যাদা, গুরুত্ব ও অপরিহার্যতাকে হেয় করার চেষ্টা করেছেন। যেমনঃ “আল্লাহর আনুগত্য” এই শিরোনাম লাগিয়ে এর গুরুত্ব ও হাকীকত বর্ণনা করতে গিয়ে মওদুদী সাহেব নামায, রোযা, হজ্জ ও তিলাওয়াতে কুরআন ইত্যাদিকে অপ্রয়োজনীয় আমলের পর্যায়ে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন।
২। বলা বাহুল্য, এভাবেই যদি কূটকৌশলে প্রত্যেকটি ফরয হুকুমের অপরিহার্যতা ও গুরুত্বকে হেয় করে দেয়া হয় কিংবা ফরয হুকুমের অত্যাবশ্যকীয়তা নাকচ করে দেয়া হয়, তাহলে আল্লাহর আনুগত্য’ দুর্লভ কিংবা অবাস্তব বিষয়ে পরিণত হবে। কেননা কোন জিনিসের মূলের অস্তিত্ব তার শাখা-প্রশাখা ছাড়া কল্পনা করা যায় না। শাখা-প্রশাখার সমন্বয়েই মূলের অস্তিত্ব প্রকাশ পায়। যেমনঃ ওমর, ওসমান, খালেদ (জুষ) শাখার সমন্বয়ে (জিন্‌ছ) মূল মানুষের অস্তিত্ব প্রকাশ পায়। এক্ষেত্রে ওমর, উসমান, খালেদ এসব মানব শাখার প্রত্যেককে অস্বীকার করলে মূল মানুষকে অস্বীকার করা হবে। কেননা, তখন মানবের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঠিক তেমনি যদি নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি-কে হেয় দৃষ্টিতে দেখা হয় অথবা অস্বীকার করা হয়, তাহলে আল্লাহর আনুগত্য বলতে কিছুই থাকবে না। তাই ইক্বামতে দ্বীনের একটি চটকদার শিরোনাম ব্যবহারের অন্তরালে ফরয হুকুমগুলোকে অপ্রয়োজনীয় সাব্যস্ত করে মওদুদী সাহেব মানুষকে বে-দ্বীন বানানোর এক অত্যাশ্চর্য এবং লেটেস্ট ফর্মূলা আবিস্কার করেছেন।
৪। মওদুদী সাহেবের এই চতুর ফর্মূলা এবং এর বাস্তবায়নে যে জঘন্য পরিণতি দেখা দেয় নিম্নের উদাহরণে তা ফুটে উঠে।
মনে করুন, একজন জমিদার ব্যক্তি তার জায়গা জমি দেখাশুনা এবং চাষাবাদের কাজের জন্য ‘দ্বীনদার’ নামক একজন কাজের গোলাম বা চাকর রাখলো। সে জমিদারের ক্ষেত-খামার ও বাগ-বাগিচা দেখাশুনার কাজ করে। অন্য দিকে ঐ জমিদারের প্রতিপালনেই বাস করে এক পণ্ডিত ব্যক্তি।
কিন্তু পন্ডিত ব্যক্তি জমিদারের প্রতি বিদ্বেষীমনা। চাকর ‘দ্বীনদার’ জমিদারের প্রতিটি আদেশ মেনে চলুক এবং এর দ্বারা চাকর ও জমিদারের
মাঝে সুসম্পর্ক বজায় থাকুক পণ্ডিত ব্যক্তি মনে-প্রাণে তা চায়না। কিন্তু পণ্ডিত ব্যক্তির এতটুকু সাহস নেই যে, সে প্রকাশ্যে এবং সরাসরি এই বিদ্বেশ চরিতার্থ করতে পারে।
তাই সে সুকৌশলে জমিদারের প্রিয় চাকরকে বিপথগামী করে তার ও জমিদারের মাঝে স্থাপিত সুসম্পর্ক নষ্ট করার জন্য এক গোপন আকর্ষণীয় ফর্মুলা আবিষ্কার করল। এ ফর্মুলা বাস্তবায়নের জন্যে চাকরের আস্থাভাজন হওয়া প্রয়োজন, তাই পণ্ডিত চাকর ‘দ্বীনদারের’ হিতাকাঙ্খী সেজে গেল। একদিন পন্ডিত চাকর দ্বীনদারকে ডেকে বললোঃ শোন মিয়া দ্বীনদার। সর্বদাই জমিদারের আনুগত্যের দিকে খেয়াল রাখবে, তার আনুগত্যে যেন কোনরূপ ত্রুটি না হয়। যদি জমিদারের পরিপূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করতে পারো, তাহলে জমিদার তোমাকেও ছোট একটি জমির (ষ্টেটের) মালিক বানিয়ে দিবে।
উল্লেখ্য যে জমিদার, চাকর ‘দ্বীনদারকে’ রেখেছিলেন নিজের বিশাল জায়গা-জমি দেখাশুনা এবং চাষাবাদ করার জন্যই কেবল। তাই তিনি একান্তভাবেই চান চাকর যেন সর্বদাই চাষাবাদে, ফসল ফলানোর কাজে এবং ফসল ঘরে তোলার কাজে লিপ্ত থাকে। আর সে কারণেই জমিদার চাকরকে জমি চাষ করতে, বাগানের আগাছা পরিস্কার করতে এবং পানির নালা-নদর্মা চলমান রাখতে আদেশ করতেন। গোলামও জমিদারের আদেশ যথাযথভাবে মেনে চলত।
এই ধারাবাহিকতায়ই একদিন চাকর ‘দ্বীনদার’ একটি জমিতে চাষের কাজ করছিলো। কোন এক ছল-ছুতায় পণ্ডিত ব্যক্তি সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলো এবং অনধিকার চর্চা করে বলতে লাগলোঃ দ্বীনদার! তুমি ভুল বুঝে বসে আছো! তুমি এই চাষের কাজকে জমিদারের আনুগত্য মনে করছো। সর্বনাশ! মূলতঃ তোমার মালিক তোমাকে যে আনুগত্যের আদেশ করেছেন, তাতো এই চাষাবাদ নয় বরং তা হলো অন্য বহুত কিছু। আর তাহলো গোটা জীবন তাঁর জন্যে উৎসর্গ করে দিতে হবে। চাষাবাদ করলেই গোলামী আর আনুগত্য হয় না।
এরপর চাকর ব্যক্তি একদিন জমিদারের নির্দেশ অনুযায়ী পাকা ফসল কাটছিল তখনও পণ্ডিত ব্যক্তি চাকর দ্বীনদারকে বলতে লাগলোঃ আরে দ্বীনদার! তুমি তো দেখছি কেবল ফসল কাটাকেই জমিদারের আনুগত্য মনে করছো। তুমি ভুল বুঝেছো, এসব কাজের জন্য জমিদার তোমাকে রাখেনি।
তৃতীয় দিন চাকর জমিদারের লেবু বাগান পরিষ্কার করছিলো। পণ্ডিত ব্যক্তি আজও চাকরকে উদ্দেশ্য করে বললো, দ্বীনদার। আফসোস, তুমি কেবল বাগান পরিস্কার করাকেই জমিদারের আনুগত্য মনে করেছ, আর তাতেই তুমি তৃপ্ত। আসলে এই চাষাবাদ, ফসল কাটা এবং বাগান পরিস্কার করাই জমিদারের আনুগত্য নয়। বরং প্রকৃতপক্ষে তোমার মালিক ‘জমিদার’ যে আনুগত্যের জন্য তোমাকে রেখেছে তা অন্য কিছু: হ্যাঁ শোন, তোমার মালিক যে আসল আনুগত্যের (গোলামীর) জন্য তোমাকে রেখেছে তা হলো প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি সেকেণ্ডে, জীবনের প্রতি পদক্ষেপে জমিদারের আনুগত্যে এবং ফরমাবরদারীতে লিপ্ত থাকবে। এই আনুগত্যে লিপ্ততার কোন নির্দিষ্ট সময় নেই, কোন নির্দিষ্ট আকার নেই। যেমন তুমি বলতে পারো না যে, তুমি এই সময়ে জমিদারের অনুগত গোলাম আর ঐ সময় অনুগত গোলাম নও। বরং সব সময়েই তুমি তার গোলাম এবং অনুগত। তাই তোমার গোটা জীবন তাঁর গোলামীতে উৎসর্গ করে দিতে হবে। চাষাবাদ, ফসল কাটার মত নির্দিষ্ট সময়ের নির্দিষ্ট কাজে গোলামী ও চাকরীর দায়িত্ব আদায় হবে না।
বলা বাহুল্য যে, এরূপ আনুগত্যের শ্লোগান, জমিদার ও চাকর ‘দ্বীনদারের’ মধ্যে দূরত্ব ও শত্রুতা সৃষ্টি করার-ই আধুনিক কৌশল।
৫। সচেতন পাঠক/পাঠিকা! উপরে উল্লেখিত উদাহরণের মতই মওদুদী সাহেব, আমরা যারা আল্লাহর সরল গোলাম তাদেরকে ইবাদতের সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা বুঝিয়ে বলেছেনঃ নামায পড়া আসল ইবাদত নয়, রোযা রাখা আসল ইবাদত নয়, হজ্জ করা বা যাকাত দেয়া আসল ইবাদত নয়, কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করা আসল ইবাদত নয়, আসল ইবাদত হলো জীবনের প্রতি মুহূর্তে আল্লাহ তা’য়ালার অনুগত থাকা।
বড়ই অনুতাপের কথা সেই সাথে হাসির কথাও কেননা নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইবাদতের আওতা থেকে বাদ পড়লে অথবা এসবের মাধ্যমে আনুগত্য না হলে আর কিসের দ্বারা আনুগত্য প্রকাশ পাবে?
বলা বাহুল্য, উপরোক্ত উদাহরণে পণ্ডিত হিতাকাঙ্খী যেমন মালিকের। জমি চাষ করা, নালা-নর্দমা পরিষ্কার করা, ফসল কাটা ইত্যাদি সকল নির্দেশ পালন থেকে গোলামকে নিরুৎসাহিত করে তার কোন নির্দেশকে বাস্তবায়ন করার কোন সুযোগই দিচ্ছিল না বরং শুধুমাত্র আনুগত্যের নসীহত করছিল, ঠিক তেমনি মওদুদী সাহেবও নামায, রোযার মত অন্যান্য প্রধান ইবাদত সমূহ বাস্তবায়নে নিরুৎসাহিত করে উম্মতে মুহাম্মাদিয়াকে কেবল আল্লাহর আনুগত্য করার শাব্দিক নসীহত করে বেড়িয়েছেন। সুতরাং সচেতন পাঠকের খেদমতে আমাদের আরজ আপনারাই বলুন এ ধরনের ওয়াজ নসীহতের দ্বারা অনুগত বান্দাদের জামায়াত তৈরি হবে নাকি নাফরমান জাহান্নামীদের জামায়াত তৈরী হবে?
৬। মওদুদী সাহেবের অন্ধ ভক্তজন আমাদের উপরে অভিযোগ করে বলতে পারেন যে, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, কুরআন তেলাওয়াত কেবল এসবই তো ইবাদত নয়, ইবাদত তো আরো অনেক রয়েছে। সুতরাং মওদুদী সাহেবের এই কথা যে, ‘নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাতই কেবল ইবাদত নয়’ অসত্য কোথায়? অথবা এরূপ বলার দ্বারা মওদুদী সাহেব কি অন্যায় করেছেন?
এ প্রশ্নের জবাবে আমাদের বক্তব্য এই যে, উপরোক্ত প্রশ্ন তখনই করা যেত যখন মওদুদী সাহেব তার লিখনীতে ‘শুধুমাত্র নামায, রোযা, হজ্জ, যিকির ও তিলাওয়াতই ইবাদত নয়’ এরূপ লিখতেন, কিন্তু না, মওদুদী সাহেব ইবাদত থেকে মানুষকে সরিয়ে দিতে চেয়ে ঢালাওভাবে লিখেছেনঃ “নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদিকেই লোকেরা ইবাদত মনে করে বসে আছে।” আসলে যে ইবাদতের জন্য আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তার নির্দিষ্ট কোন সময় নেই এবং নির্দিষ্ট কোন আকার-আকৃতিও নেই।”
পাঠক/পাঠিকাবৃন্দ। আপনারাই বলুনঃ এরূপ কথা আপনারা বে-দ্বীন ছাড়া কোন ইসলামী ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে কখনও শুনেছেন? অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে আসল ইবাদত নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত প্রত্যেকটিরই নির্দিষ্ট সময় রয়েছে এবং আকার-আকৃতিও রয়েছে।
রাসূল (সা.) ইরশাদ করেনঃ
يكون في آخر الزمان دجَّالُونَ كَذَّابُونَ يَأْتُونَكُم من الأحاديث بما لَمْ تَسْمَعُوا أَنْتُمْ وَلَا أَبَاؤُكُم لا يُضِلُّونَكُم ولا يُفْتِنُونَكُم (مسلم)
৭। বলা বাহুল্য, মওদুদী সাহেবের মনগড়া আসল ইবাদতের কোন নির্দিষ্ট সময় না থাকলেও কুরআনে বর্ণিত আসল ইবাদতের সময় নির্ধারিত রয়েছে এবং ঐ ইবাদতের আকৃতি বা রূপও রয়েছে। যেমনঃ কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছেঃ
إِنَّ الصَّلوةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا
“মুমিনদের জন্য নির্ধারিত সময়ে নামায আদায় করা ফরজ করা হয়েছে।” (সূরা নিসা)
নামায পাঁচ নির্ধারিত সময়ে পড়তে আদেশ করে ইরশাদ হয়েছেঃ
وَسَبِّحُ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا وَمِنْ أَنَاءِ اللَّيْلِ فَسَبِّحُ وَأَطْرَافَ النَّهَارِ لَعَلَّكَ ترضى
“আর আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসা মহিমা বর্ণনা করুন (নামায পড়ুন) সূর্যোদয়ের পূর্বে, সূর্যাস্তের পূর্বে, রাতের কিছু অংশে এবং দিবা ভাগে। যাতে করে আপনি সন্তুষ্ট হতে পারেন। (সূরা ত্বা-হাঃ ১৩০)
অনুরূপভাবে রোযা নির্দিষ্ট রমযান মাসে রাখতে আদেশ করে ইরশাদ করা হয়েছেঃ
فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمُهُ
তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রমযান মাস পাবে সে যেন অবশ্যই রোযা রাখে। (সূরা বাকারা)
৮। ইবাদতে মাকসুদা বা মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যগত ইবাদত যথাঃ নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকর এবং তিলাওয়াতে কুরআন ইত্যাদি প্রকৃতিগত ভাবেই মুমিনের অন্তরে বিনয় সৃষ্টি করে এবং সেই সাথে আল্লাহর ভয়ও হৃদয়ে জাগ্রত করে। যার পরিণতিতে মানবতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, সমব্যথিতা, অন্যের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া ইত্যাদি মানবিক গুণের দ্বারা নামাযীর হৃদয় উদ্ভাসিত হয়। মোটকথা ফরজ ইবাদতের স্থায়ী ও সার্বক্ষণিক বাস্তবায়ন ব্যতিরেকে মানুষের হৃদয় আলোকিত হয় না। এই মূল ইবাদতের দ্বারা মানুষের আত্মিক উৎকর্ষ সাধনের স্বভাব দিয়েই আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু মিষ্টার মওদুদী বিষয়টিকে অনুধাবন করতে পারেন নি।
৯। নামায, রোযার মত ইবাদতের দ্বারা মানুষের অন্তরে যেখানে বিনয় ও নম্রতা সৃষ্টি হয়, সেখানে ইবাদতের প্রতি মুমিনগণ বীতশ্রদ্ধ বা নিরুৎসাহিত হলে এবং ইবাদতের গুরুত্ব মানুষের অন্তর থেকে তিরোহিত হয়ে গেলে অহংকার, ঔদ্ধত্য, মিথ্যা, জুলুম-সন্ত্রাস, অর্থ-লোভ, পরনিন্দা, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি অমানবিক অসৎ চরিত্রের প্রসার ঘটবে।
১০। মওদুদী সাহেব এভাবেই কি মুমিন জাতিকে তাদের উন্নত তাহযীব-তামাদ্দুন, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও মানবীয় গুণাবলী থেকে আউট করে দিতে চান তথাকথিত আনুগত্যের মতলবী শ্লোগানের দ্বারা?
১১। মওদুদী সাহেব তার রচিত খুত্বাত বইতে লিখেছেন। কারো মুখঃ- ভর্তি দাড়ি, কপালে সিজদার দাগ, গীরার উপরে পরিহিত পাজামা, লম্বা নামায, দীর্ঘ তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদি দেখে, তাকে মাওলানা, দ্বীনদার বা পরহেজগার মনে করা বিভ্রান্তি (গলত অনুভূতি) ছাড়া কিছু নয়। (খুতবাত পৃঃ ১৩৪-১৩৫)
নিজের মুখে ব্রাশের মত ইঞ্চি দেড় ইঞ্চি দাড়ি রেখে মওদুদী সাহেব ইবাদত এবং দ্বীনী শেআ’র ও প্রতিকের প্রতি অত্যন্ত ধৃষ্টতার সাথে নির্লজ্জ ঠাট্টা ও সমালোচনা করেছেন যা প্রকারান্তরে কুফুরী। কেননা হাদীসে পাকে কেবল দাড়ি রাখতে বলা হয়নি বরং দাড়ি লম্বা করতে আদেশ করা হয়েছে। মুশরিক বা অন্য বিজাতীয়রা মোচ লম্বা ও দাড়ি খাটো করে রাখতো, তাই হাদীসে মুমিনদেরকে তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে দাড়ি লম্বা করতে বলা হয়েছে, যা মুসলিম জাতির নিজস্ব ইউনিফর্ম।
১২। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিন জাতির পুরুষগণকে টাখনু গীরার উপরে কাপড়-পাজামা পরিধান করতে বলেছেন
হাদীস শরীফে টাখনু গীরার নীচে কাপড়-পায়জামা পরিধানকারীকে অগ্নি দহন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। এসব বিষয়ে ঠাট্টা বা সস্তা সমালোচনার কোনই অবকাশ নেই। বরং এরূপ করা কুফুরী। দ্বীনদারী বা পরহেজগারীর প্রকাশ্য নিদর্শন বাহ্যিক বেশ-ভূষাই। কেননা ভিতরগতভাবে কে কতটা দ্বীনদার, তা তালাশ করে বের করা সম্ভব নয়। তাছাড়া দ্বীনদারী কি আর বে-দ্বীনী কি তা নিরুপণ করার রাডার তৈরীর একক অধিকার মওদুদী সাহেবকে কেউ দেয়নি।
১৩। বর্তমান পৃথিবীতে কুফুরী, গোমরাহী, খুন-খারাবী, রাজনৈতিক প্রতারণা, সন্ত্রাস, রগকাটা, ব্যভিচার, অশ্লীলতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। জান-মাল, ইজ্জত-আবরু মোটেই নিরাপদ নয়। এমতাবস্থায় জরিপ চালানো হলে দেখা যাবে বে-নামাযী মুসলমানের তুলনায় নামাযী মুসলমানরাই অধিক আমানতদার, সভ্য, ভদ্র এবং মানবিক গুণের অধিকারী। এরূপ আস্থাভাজন দ্বীনদার ইবাদত গুযার নামাযী ব্যক্তিদের ঠাট্টা বিদ্রুপ করার দ্বারা মওদুদী সাহেব ইসলামের দুশমন ছাড়া আর কাদেরকে খুশী করেছেন? আল্লাহ তা’য়ালা ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপকারীদের সম্পর্কে ইরশাদ করেনঃ
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَكُمْ هُزُوًا وَلَعِبًا مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَالْكُفَّارَ أَوْلِيَاءَ
হে ঈমানদারগণ! যারা তোমাদের পূর্বে কিতাবপ্রাপ্ত হয়েছে এবং অন্যান্য কাফের যাদের অবস্থা এরূপ যে, তারা তোমাদের ধর্মকে হাসি-তামাশার বস্তু বানিয়ে রেখেছে। তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।’
১৪। মহান আল্লাহ তা’য়ালা কুরআনে কারীমে সাহাবায়ে কেরামের যেসব বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করে তাদের প্রশংসা করেছেন তন্মধ্যে তাদের লম্বা নামায এবং কপালে সিজদার দাগ অন্যতম। যেমন ইরশাদ হয়েছেঃ
تَرَاهُمْ رُكَعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ
“আপনি তাদেরকে (সাহাবায়ে কেরামকে) দেখতে পাবেন রুকু এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়তে। তারা এভাবেই মহান আল্লাহর মেহেরবাণী এবং সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে। তাদের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো তাদের চেহারায় সিজদার চিহ্ন বিদ্যমান’। (সূরা ফাতহ)
১৫। বলা বাহুল্য, মওদুদী সাহেব আল্লাহর সন্তোষভাজন এই সাহাবায়ে কিরামের আপত্তিকর সমালোচনা করতে যেমন পরোয়া করেননি, অন্য দিকে উম্মতে মুহাম্মাদীর বিশিষ্ট আল্লাহ ওয়ালা বুযুর্গ, মুহাদ্দিস, ফকীহ আলেম ও দাড়িওয়ালা মুসলমানদের বিভিন্নভাবে ঠাট্টা-বিদ্রুপ এবং হেয় প্রতিপন্ন করার খেলায়ও মেতেছেন। মওদুদী সাহেবের লিখনীতে প্রচুর পরিমাণে এরূপ ঠাট্টা-বিদ্রূপমূলক বাক্য বিদ্যমান। এরূপ গর্হিত কাজে লিপ্ত হয়ে মওদুদী সাহেব মূলতঃই ঐসব হীন অপরাধীদের দলে শরীক হয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালা যাদের অবস্থা বর্ণনা করে বলেনঃ
إِنَّ الَّذِينَ أَجْرَمُوا كَانُوا مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا يَضْحَكُونَ وَإِذَا مَرُّوا بِهِمْ يَتَغَامَزُونَ وَإِذَا انْقَلَبُوا إِلَى أَهْلِهِمُ انقَلَبُوا فَكِهِينَ وَإِذَا رَأَوْهُمْ قَالُوا إِنَّ هَؤُلَاءِ لَضَالُّونَ
“এরাই হলো ঐ সকল অপরাধী, যারা মুমিন দ্বীনদারদের দেখে বিদ্রুপের হাসি হাসতো (ঠাট্টা করতো), আর যখন তারা (ঈমানদারগণ) তাদের সম্মুখ দিয়ে গমন করত তখন তারা পরস্পর চোখ টিপাটিপি করত। যখন তাদের দেখতো বলতো এরা গোমরাহ।” (সূরা মুতাফফিফীন)
(সত্যিই জামায়াত-শিবিরের সদস্যগণ যখনই কোন আলিম, তাবলীগী অথবা কোন হক্কানী পীরের মুরীদ বা দ্বীনদার লোককে দেখেন তখন তারা এ ধরনের আচরণ করে থাকেন।)
ক্বিয়ামতের দিনে এদের অবস্থার আলোচনা করে কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে:
فَالْيَوْمَ الَّذِينَ آمَنُوا مِنَ الْكُفَّارِ يَضْحَكُونَ عَلَى الْأَرَائِكِ يَنْظُرُونَ هَلْ ثُوبَ الْكُفَّارُ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ –
‘আজ (কিয়ামত দিবসে) মুমিনগণ কাফিরদের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ করবে, আরামদায়ক আসনে বসে মুমিনরা কাফেরদের (শাস্তি) প্রত্যক্ষ করবে। সে দিন অবাধ্যদের কৃতকর্ম অনুযায়ী যথাযথই বদলা দেয়া হবে’। (সূরা মুতাফফিফীন)
১৬। ইসলামী শরীয়তের বিধান মতে যে ব্যক্তি ইসলামের প্রতীকসমূহ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে সে যেন কুফুরী করল। সুতরাং যে ব্যক্তি নামায, রোযা, যিকির ও তেলাওয়াত ইত্যাদি বিষয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে ইসলামী ফতোয়া মতে সে কুফরীতে লিপ্ত হয়ে যায়, এ ধরনের লোকের মজলিসে বসা বা তার আলোচনা শোনা জায়েয নয়।
১৭। মওদুদী সাহেব বলেছেনঃ জিহাদ এবং ইসলামী হুকুমতের জন্য নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি হলো ‘ট্রেনিং কোর্স’ তা সত্যিই এক ধৃষ্ঠ বাচালতা।’ একে মওদুদী সাহেবের অতি উর্বর মস্তিস্কের “উন্মাদ” ঘোষণা বললেও অত্যুক্তি হবে না। মওদুদী সাহেবের মত একজন ধীমান অথচ প্রাইমারী পর্যায়ের দ্বীনী শিক্ষিত ব্যক্তির মুখ থেকে এরূপ নিজস্ব ধর্ম গবেষণা বিষয়ক উক্তি প্রকাশ পাওয়া অভাবনীয় নয়।
নাঃ কুরআন-হাদীসের সাথে উক্ত মন্তব্যের কোন সম্পর্ক নেই। বরং কুরআন হাদীস এর বিপরীত নির্দেশনা প্রদান করেছে। সূরা হজ্জের ৪১ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেছেনঃ
الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَتُوا الزَّكُوةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
“আমি যখন তাদেরকে (মুমিনদেরকে) পৃথিবীর কোন এলাকার (শাসনক্ষমতা) কর্তৃত্ব প্রদান করি তখন তারা নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তারা সৎকাজের নির্দেশ করে এবং অসৎ ও মন্দ কাজ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখে।”
এ আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা নামায, যাকাত ইত্যাদিকে আসল করণীয় বা উদ্দেশ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। অথচ মওদুদী সাহেব নামায রোযা, হজ্জ, যাকাত যা উদ্দেশ্য তাকে বানিয়ে ফেলেছেন সহায়ক আর হুকুমত যা সহায়ক (উদ্দেশ্য নয়) তাকে বানিয়ে নিয়েছে উদ্দেশ্য। একদিকে আল্লাহ তা’য়ালা আর অপরদিকে মওদুদী সাহেব। আমরা কার কথা মানবো?
একথা এবং এ দাবী বাস্তব যে, কুরআন ও সুন্নাহপন্থী আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াত অকুণ্ঠচিত্তে নিঃশর্তভাবে আল্লাহর কথায় বিশ্বাসী এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনয়নকারী। আর জামায়াত শিবির সম্প্রদায় মওদুদী সাহেবের কথায় বিশ্বাসী। তারা মওদুদীর ব্যাখ্যার প্রতি নিবিষ্টচিত্তে ঈমান এনেছেন। সুতরাং এ দুইয়ের ব্যবধান স্পষ্ট এবং অবধারিত।
কোন মুসলমানই আল্লাহকে বাদ দিয়ে রাসূল (সা.) কে বাদ দিয়ে এক ভ্রান্ত ব্যক্তির কথায় অন্ধ বিশ্বাসী হতে পারেনা।
১৮। মূলতঃই নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকির, তিলাওয়াত ইত্যাদি (ইবাদত) যা ইসলামের মূল স্তম্ভ যার প্রতি আদেশ করে শত শত আয়াত নাযিল করেছেন আল্লাহ তা’য়ালা, সেসব বিকল্পহীন অপরিহার্য বিষয়গুলোকে মওদুদী সাহেব কি করে হুকুমতের (শাসন ক্ষমতার) জন্য পূর্ব উপাদান (ট্রেনিং কোর্স) মনে করলেন? অথচ হুকুমত বা শাসন ক্ষমতা মূল দ্বীন নয় বরং তা হলো দ্বীনের প্রশাসনিক অংশ এবং মূল দ্বীনের সহায়ক শক্তি।
১৯। মূলতঃ মওদুদী সাহেব রাষ্ট্র সরকার প্রতিষ্ঠাকে মূল দ্বীন এবং মূল দ্বীনকে ট্রেনিং কোর্স আখ্যা দিয়ে যে নির্বোধের কর্মটি করেছেন তাহলো তিনি মানুষের শরীরের পরিহিত পোষাককে মূল মানুষ আর মূল মানুষকে পোষাক বলে পরিচিত করেছেন। হ্যাঁ এভাবেই যা যা নয় তাকে তা বলে চালিয়ে দিতে চেয়ে তিনি সরল মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় মেতেছেন।
২০। যদি মূলতঃই নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত হুকুমত কায়েম করার জন্য ট্রেনিং কোর্স হয়, তাহলে তো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়ে যাওয়ার পর আসল দ্বীন (রাষ্ট্র পরিচালনার) কাজেই সর্বদা ব্যস্ত থাকা অপরিহার্য হয়ে যাবে তাইনা? যদি তা-ই হয়, তাহলে তখন তো আর নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকির এর প্রয়োজন মোটেও থাকবে না। কেননা ট্রেনিং কোর্স ততক্ষণই দরকার পড়ে যতক্ষণ ট্রেনিং এর উদ্দেশ্য সাধন না হয়। হ্যাঁ নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকির, তিলাওয়াত বর্জিত এমন প্লাষ্টিক দ্বীন, এমন প্রগতিশীল খাহেশাত মার্কা হুকুমত কায়েম করা কেবল জামায়াতীদের মুখ্য উদ্দেশ্য হতে পারে, আর কারো নয়।
২১। কোন মুজাহিদ রণাঙ্গনে গিয়ে শত্রুর মুকাবেলায় জিহাদ ছেড়ে দিয়ে যদি ট্রেনিংএ ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তবে তাকে পাগল মনে করা হবে অথবা শত্রুর সাথে তার আতাত থাকার ধারণা করা হবে। এখন যদি নামায, রোযা, যিকির ও তেলাওয়াত ইত্যাদি ইসলামী হুকুমতের জন্যে ট্রেনিং হয়, তাহলে হুকুমত কায়েম হওয়ার পর হুকুমতের কর্মে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকা জরুরী। কোন ব্যক্তি যদি হুকুমত কায়েম হওয়ার পরও ট্রেনিং পর্যায়ের কাজে (নামায, রোযা ইত্যাদিতে) ব্যস্ত থাকে মওদুদী ধর্ম মতে তার শাস্তি কি হবে?
২২। মওদুদী সাহেবের অভিমত যদি বাস্তবসম্মত ধরে নেয়া যায়, তাহলে এমনটি হওয়া উচিত যে, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকির, তিলাওয়াত ইত্যাদি ট্রেনিং কোর্সে যে যত বেশী পারদর্শী হবে (যেমন, বেশী নামাযী, অধিক রোযাদার, বেশী যিকিরকারী আউলিয়ায়ে কেরাম, অধিক কুরআন তেলাওয়াতকারী হাফেজ সাহেবগণ, তাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিক পারদর্শী হবেন। কেনানা ট্রেনিং কোর্স যত পূর্ণাঙ্গতার সাথে আদায় করা হয়, তার পরিণতি তত সমৃদ্ধশালী হয়। কিন্তু না, এক্ষেত্রে বাস্তবতা এর উল্টোটাই বেশী চোখে পড়ে।
মূলতঃ নামাজ, রোযা, যিকির, তেলাওয়াত ইত্যাদিই মূল ইবাদত। এই ইবাদত জিহাদ বা রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জনের ট্রেনিং কোর্স নয়। তাইতো সব নবী-রাসূলগণই নামাযী ছিলেন, সব ওলী আল্লাহগণই ইবাদত গোজার ছিলেন কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জনকারী ছিলেন না।
২৩। মওদুদী সাহেবের কথা অনুযায়ী নামায, রোযা ও অন্যান্য ইবাদত যদি হুকুমত (রাষ্ট্র) পরিচালনার পূর্ব প্রস্তুতি হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে মহিলা এবং বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের উপর নামায, রোযা ফরজ থাকে কেন? কেননা নারী এবং বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা তো রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিচালনার উপযোগী নন!
বাহুল্য, যদি কোন ব্যক্তি নামায, রোযা, যিকির, তিলাওয়াত, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি আদায় করার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত না করে বরং এ সব কে হুকুমত অর্জনের কিংবা জিহাদের ট্রেনিং কোর্স মনে করে (যেমন জামায়াত শিবিরের সদস্যগণ) তবে কুরআন-হাদীসের মতে ঐ ব্যক্তির কোন ইবাদতই গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং তার নামায নষ্ট ‘হয়ে যাবে, এরূপ নামাযকে নামাযীর মুখে নিক্ষেপ করে দেয়া হবে। হ্যাঁ এভাবেই মওদুদী দর্শন আমাদেরকে আমাদের ইবাদত ধ্বংস করার অসৎ পরামর্শ দেয়। আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে অভিশাপের পথে ধাবিত হতে।
২৫। মওদুদী দর্শন মোতাবেক যদি কেউ ইসলামী হুকুমতের ট্রেনিং কোর্সে উন্নতি সাধন করার জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাযের সাথে এক হাজার রাকাত নফল নামাযও পড়ে অথবা ট্রেনিং কোর্স মনে করে এক মাস রোযার সাথে অতিরিক্ত আরও ছয় মাস রোযা রাখে তবে এই সব ট্রেনিং কোর্স দ্বারা তার কপালে জুটবে মহান রাব্বুল আলামীনের অসন্তুষ্টি ও আযাব তথা জাহান্নাম। সুতরাং সাধু সাবধান! দেখে নেও ফরম পূর্ণ ও পার্টির ক্যাডারে উত্তীর্ণ হওয়া বা ট্রেনিং এর নিয়্যতে নামায আদায় করেছো, না আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে?
২৬। মওদুদী সাহেব তার রচিত খুতবাত নামক বইতে লিখেছেনঃ
“বস্তুতঃ ইসলাম নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদতসমূহ সেই উদ্দেশ্যের (রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার) প্রস্তুতির জন্য নির্দিষ্ট করেছে। দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র শক্তির নিজ নিজ সেনাবাহিনী পুলিশ ও সিভিল সার্ভিসের কর্মচারীদের সর্বপ্রথম এক বিশেষ ধরনের ট্রেনিং দিয়ে থাকে। ঐ ট্রেনিংয়ে উপযুক্ত প্রমাণিত হলে তাকে নির্দিষ্ট কাজে নিযুক্ত করা হয়। ইসলামও তার কর্মচারীদের সর্বপ্রথম এক বিশেষ ধরনের ট্রেনিং দিতে চায়। এরপরই তাদের জিহাদ ও ইসলাম কায়েম করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়”। (খুতবাত পৃঃ ৩১৫. ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা পৃঃ ২৫৪)
মওদুদী সাহেবের এ থিউরীতে বিশ্বাসী জামায়াত ও শিবিরের ভাইদের জিজ্ঞাসা করতে চাই, আপনাদের এইসব কল্পিত ধর্মীয় আকীদা সত্য হওয়ার কোন উদাহরণ কি দেখাতে পারবেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে যোগ্য রাষ্ট্র পরিচালক তো পৃথিবীতে আর কেউ ছিল
না, সেই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তো নামাযের প্রতি পূর্ণ যত্নবান ছিলেন। এমনকি যখন দাঁড়িয়ে নামায পড়তে পারতেন না তখন বসে বসেও নামায পড়তেন। তাহলে তখনও কি তার রাষ্ট্র পরিচালনা করার যোগ্যতা অর্জন করা বাকী ছিল?
২৭। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায ও রোযা ছাড়াই নবুওয়াত্ লাভ করলেন এবং রিসালাতের দায়িত্ব ও আদায় করতে পারলেন অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা ছিল না বিধায় তাকে নামায, রোযা ট্রেনিং কোর্স হিসেবে আদায় করতে হয়েছে? নবুওয়াত, রিসালাত এত সস্থা যে কোন ট্রেনিং ছাড়া পাওয়া যায় আর রাষ্ট্র নায়ক হওয়া এত কঠিন ও মূল্যবান যে তার জন্য ১৩-১৪ বৎসর নবী (সাঃ)-কে ট্রেনিং নিতে হলো-তাই কি?
২৮। হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক। দীর্ঘ তের বছর মক্কা শরীফে নবুওয়াতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের পর পরবর্তী দশ বছর মদীনায় বিচক্ষণতার সাথে রাষ্ট পরিচালনা করেছেন। নামায যদি মুখ্য ইবাদত না হত, তাহলে তিনি বলিষ্ঠ এবং আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হওয়া সত্ত্বেও সারা রাত জেগে কেন নামায পড়তেন? কেন কুরআন তিলাওয়াত করতেন? এরপরও আমাদের বলতে হবে নামায আসল ইবাদত নয় বরং রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ব প্রস্তুতি বা ট্রেনিং। তা কি দ্বীন বিষয়ক ব্যাখ্যা হবে? নাকি হবে মাতাল উম্মাদের আবোল-তাবোল প্রলাপ?
২৯। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকির, তিলাওয়াত ইত্যাদি যদি মুখ্য ইবাদত না হত, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে খিলাফতে রাশেদার স্বর্ণ যুগে এইসব ইবাদত কেন গুরুত্বহীন হয়ে যায়নি? কেন ঐসব সফল রাষ্ট্রনায়ক খুলাফায়ে রাশেদীন এবং সে যুগের শ্রেষ্ঠ মুমিনগণ গুরুত্বের সাথে ঐসব ইবাদত আদায় করতেন? এমনকি আমরা তো দেখতে পাই আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার পরও তারা ঈদ, জুমুআ এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের ইমামতির দায়িত্ব পালনে রত থেকেছেন মূল ইবাদত পালনার্থেই কেবল। রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জনের উদ্দেশ্য তো তাদের অনেক আগেই হাসিল হয়ে গিয়েছিল। মওদুদী সাহেবের এই উদ্ভট মন্তব্যের বাস্তবতা ভিত্তিক সামান্য কোন যুক্তিও কি আছে? যুক্তিহীন, দলীলহীন বাস্তবতা বর্জিত এসব বস্তাপচা প্রলাপ; তারপরও কি আঁকড়ে ধরে থাকবেন জামায়াত শিবিরের সচেতন ভায়েরা?
৩০। মওদুদী সাহেবের কথা মতো নবী-রাসূলগণের এ পৃথিবীতে আগমনের মূল উদ্দেশ্য যদি রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জন হতো, তাহলে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ.) নিজে এবং তাঁর সন্তানদের নামায কায়েমকারী হওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন না বরং রাষ্ট্র নায়ক হওয়ার জন্যই দোয়া করতেন।
৩১। যদি কেউ বলে যে, অনেক নবীর নবুওয়াত ট্রেনিং কোর্সেই শেষ হয়ে গেছে, তিনি মূল দ্বীন যা নবুওয়াতের আসল উদ্দেশ্য তা করতে পারেননি, (যেমন মওদুদী বলেছেন) তাহলে তার ঈমান থাকবে কি?
৩২। বলা বাহুল্য নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকির, তিলাওয়াত ইত্যাদি মূল ইবাদতকে ট্রেনিং কোর্স বলে মওদুদী সাহেব যে ফতওয়া দিয়েছেন, তাকে যদি ইসলামের ব্যাখ্যা বা ফতওয়া বলে ধরা হয়, তাহলেই উপরে উল্লেখিত পর্যালোচনা বা বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে। আর যদি মওদুদীর উপরোক্ত মন্তব্যকে মওদুদী ধর্মের ফতওয়া বা মওদুদী ধর্মমত হিসেবে প্রচার করা হয়, তাহলে আমাদের আপত্তির পদ্ধতি হবে ভিন্ন।

সুধী পাঠক/পাঠিকা! আপনারা নিশ্চয়ই ইসলাম অনুসরণ করতে চান মওদুদী ধর্মমত নয়! তাই নয় কি?
৩৩। বলাবাহুল্য মওদুদী সাহেবের এই মন্তব্য যে, “দুনিয়ার কাজ-কর্ম পরিত্যাগ করে মসজিদের এক কোনায় বসে যাওয়া এবং আল্লাহ আল্লাহ যিকির করা ইবাদত নয়” এটা মওদুদী সাহেবের মনগড়া ধৃষ্ঠতা তথা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধমূলক মন্তব্য। কেননা, ইবাদত অর্থই তো হলো নিজেকে হেয় ও অবনমিত করে আল্লাহর দরবারে পেশ করা এবং তাঁর সর্বোচ্চ বড়ত্ব প্রকাশ করা, নীরবে নিভৃতে মসজিদের কোনায় আল্লাহ আল্লাহ যিকিরের মাধ্যমে তা-ই করা হয়। সত্যিই মওদুদী সাহেবের কৃত এমন
মনগড়া জঘন্য মন্তব্য আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের কেউ কখনও মেনে নেয়নি। বরং একথাই যুগে যুগে পরীক্ষিত সত্য হয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে যে, যারা আল্লাহর স্মরণে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পেরেছেন, আল্লাহ প্রেমে যারা নিজেকে বিলীন করে দিয়েছেন তারাই হয়েছেন মহা সৌভাগ্যবান। যেমন-হযরত ওয়েস জ্বরনী, মালেক ইবনে দীনার, ফুযায়ল ইবনে ইয়ায, ইবরাহীম ইবনে আদহাম, যুননুন মিসরী, বিশরে হাফী, শিবলী, শামছে তাবরেযী, জালালুদ্দীন রুমী, কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী, ফরিদুদ্দীন শাকারগঞ্জ, নিযামুদ্দীন আউলিয়া, আলাউদ্দিন ছাবির কালুয়ারী (রহ.) প্রমুখ আউলিয়ায়ে কেরাম।
এ ধরনের লক্ষাধিক আউলিয়ায়ে কেরাম দুনিয়ার সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছেড়ে দিয়ে নামায, রোযা, যিকির-আযকারে উন্নতি অর্জন করেই ইবাদতের পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে ধন্য হয়েছেন।
এ কাফেলায় মুহাদ্দিসীনের মধ্যে রয়েছেন ইমাম যুহরী, আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক, আবু হাতীম, আবু যুর’আ, ইবনে আবী হাতীম, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ্ প্রমূখ মুহাদ্দিসীনে কেরাম, যাদের দুনিয়ার সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না। তারা গোটা জীবন হাদীসের খেদমতে উৎসর্গ করে দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও মওদুদী সাহেবের ফতওয়া মতে এসব মহামনীষীদের জীবন নাকি ইবাদতবিহীন বেকার কেটেছে। কারণ তাঁরা দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক রাখেননি।
৩৪। মওদুদী সাহেব বলেছেনঃ “জিহাদের বাসনা না হলে ইবাদত একেবারেই অর্থহীন।’ চমৎকার অভিনব মন্তব্য বটে। সেই সাথে আকর্ষণীয়ও বটে। অবশ্য এইসব চমৎকারিত্ব, অভিনবত্ব এবং আকর্ষণ-কৃতিত্ব সবকিছুই মওদুদী সাহেবের নিজ ঘরের তৈরী। কেননা কুরআন-হাদীসের কোথাও ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য ‘জিহাদ’কে শর্ত হিসাবে আরোপ করা হয়নি। জিহাদের বাসনা আছে তো ইবাদত অর্থময়, জিহাদ নেই তো ইবাদত প্রাণহীন, একথার কোন প্রমাণ কুরআন-হাদীসে মওদুদীবাদীগণ দেখাতে পারবেন না। কোন নকী-রাসূল অথবা সাহাবা,’
তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী, মুহাদ্দিস, মুফাসসির এমনকি কোন মুজাহিদ-সিপাহসালারও ইশারা-ইঙ্গিতেও এর কোন স্বাক্ষর রাখেননি যে, জিহাদ থাকলেই ইবাদত ইবাদতের মত হয় আর জিহাদ না থাকলে ইবাদত নিছক রুসুম রেওয়াজের মত কিছু একটা হয়ে যায়।
না: বীর সাহসী ‘আল্লাহর তলোয়ারঃ উপাধী প্রাপ্ত সিপাহসালার খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং পরবর্তী অকুতোভয় ইসলামের জানবাজ মুজাহিদ মুহাম্মদ বিন কাসিম এবং তারিক ইবনে যিয়াদ বিজয়ী হয়ে জিহাদের ময়দান থেকে ফিরে এসে অথবা আগে-পরে কখনও এই অনুভূতি প্রকাশ করেননি যে জিহাদ না থাকলে ইবাদতের প্রাণ থাকে না। শুধু কি তাই। আমরা তো দেখি কুরআনে কারীমে যুদ্ধ চলাকালেও সৈনিকদের জামায়াতে। নামায পড়ার আদেশ ও নিয়ম বাতলানো হয়েছে। (সূরা নিসা দ্রষ্টব্য)
তবে হ্যাঁ, মওদুদী ধর্মমতে জামায়াত বিরোধীদের রগকাটা ও হত্যাকরার সন্ত্রাস নামী জেহাদ না থাকলে তাদের নিজস্ব ইবাদত প্রাণহীন, অর্থহীন হতে পারে বটে!
আমার মনে হয় মওদুদীর ঐ জিহাদী জযবা থেকে এখনকার মওদুদীপন্থীরা ক্রমশঃ পিছে সরে যাচ্ছেন। কেননা এতদিনে দুইটি মন্ত্রিত্ব লাভ করার পর আগের মত সেই জিহাদী শ্লোগান “জিহাদ জিহাদ জিহাদ চাই, জিহাদ করে বাচতে চাই’ এখন আর তাদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে না। এরই নাম কি জিহাদ? এ-ই কি ইবাদত কবুল হওয়ার শর্ত? সচেতন পাঠক/পাঠিকা। আপনারাই বলুন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ক্যাটাগরির আরো
© All rights reserved © 2019 www.izharehaq.com
Theme Customized BY Md Maruf Zakir